সর্পগন্ধা

পরিচিতি

বাংলা নাম   সর্পগন্ধা, ছোটচাঁদ
ইউনানী নাম উসরোল
আয়ুর্বেদিক নাম সর্পগন্ধা
ইংরেজি নাম   Sankeroot
বৈজ্ঞানিক নাম  Rouvolfia serpentana (Linn) Benth
পরিবার Apocynaceae

 

 

সর্পগন্ধা একটি চিরহরিৎ গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। এটি ১৫-৪৫ সে.মি. পর্যন্ত উঁচু হয়। বিশেষ শাখা-প্রশাখা হয় না। মালতী ফুল গাছের মতো পাতাগুলো কান্ডের চারিদিকে গজায়। কান্ডশীর্ষে পুষ্পদন্ডে মৃদু গন্ধময় হালকা গোলাপি রং এর  গুচ্ছাকারে ফুল প্রস্ফুটিত হয়। গূস্মকাল ফুল ফোটার প্রধাণ মৌসুম। বর্ষার শেষ দিকে ফুল থেকে ফল হয়। কাঁচা ফলের রং সবুজ, পাকলে কালো জামের মতো রং ধারণ করে। ফলের মধ্যে জোড়ায় জোড়ায় বিচি থাকে। এর মূল দেখতে মোটা, এর ব্যাস ২-৪ সে.মি. পর্যন্ত হয়, তবে ভঙ্গুর এবং রং ধূসর ও পীত বর্ণের। কাঁচা মুলের গন্ধ কাঁচা তেঁতুলের মতো। সর্পগন্ধার অপর নাম নাকফুলি আবার কেউ কেউ বলে ছোটচাঁদ।

বিস্তৃতি
সর্পগন্ধা বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, নেপাল, ভূটান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় দেখা যায়। বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ব্যাপক পরিমানে সর্পগন্ধ্যা গাছটি চোখে পড়ে। এছাড়াও দিনাজপুর,  সিলেট, চট্রগ্রামও পার্বত্য চট্রগ্রামে বিক্ষিপ্তভাবে দেখা যায়।

বীজ সংগ্রহ ও চারা উৎপাদন

বংশ বিস্তার
সাধারণত বীজ থেকে গাছটির বংশবিস্তার হয়।

 

বীজ আহরণ ও চারা উৎপাদন

বীজ সংগ্রেহের সময় আগষ্ট-নভেম্বর। সর্পগন্ধার ফুল ও ফল দীর্ঘ সময় পর্যন্ত গাছে থাকে। একই গাছে ফুল এবং কাঁচা ও পাকা ফল দেখা গেছে। পাকা ফলের রং ঘণ নীল বা কালচে বর্ণের। এটি ড্রুপ, ব্যাস ০.৫ সে.মি. হয়। পাকা ফলের রসালো অংশ ছড়িয়ে বীজ আলাদা করে হালকা রোদে শুকিয়ে পাঁচ ছয় মাস পর্যন্ত সংনক্ষন করা যায়। বীজ, শেকড় কাটিং বা শাখা কাটিং করে সর্পগন্ধার চারা উৎপাদন করা যায়। তবে বীজ থেকে চারা উৎপাদন করাই উত্তম। বীজের ওজন প্রতি কেজিতে ১৯০০০-২৫০০০টি। বীজ বপনের পূর্বে ২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। মে মাসে বীজতলায় বীজ দিলে ৩০-৪০ দিনের মধ্যে চারা গজায়। বীজ অঙ্কুরোদগম হার শতকরা ৩০-৪০ ভাগ। বীজের মান খারাপ হলে শতকরা ২০-২৫ ভাগ হতে পারে।

জমি তৈরী ও চারা রোপন

আনুপাতিক হারে মাটি, গোবর ও সার মিশিয়ে বীজতলা তৈরী করা হয়। বীজ বিপনের  ৩০-৪০ দিনের মধ্যে চারা গজায়। চারার বয়স ৩-৪ মাস হলে চারা তুলে রসযুক্ত মাটিতে রোপন করতে হয়। বড় গাছের ছায়ায় এর চাষ ভাল হয়।

রাসায়নিক উপাদান
মূলে রিসার্পিন, ডিসার্পিডিন ও রেসিনামিন নামক তিনটি ঔষধি অ্যালকালয়েড ও বহু সংখ্যক অন্যান্য অ্যালকালয়েড, স্টেরল, তেল, রজন ও ওলিক এসিড বিদ্যমান।

ব্যবহার্য অংশ ও ঔষধি গুণ

ব্যবহার্য অংশ
সাধারনত মূল ব্যবহার হয়ে থাকে।   

ঔষধি গুণ
১। (ক) সর্পগন্ধার শিকড় রক্তচাপ কমায়, স্নায়ুতন্ত্র শিথিল করে ও উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করে (Said, 1996) । যদিও নাম সর্পগন্ধা কিন্তু পাশ্চাত্য চিকিৎসকগণ এটি এখন ব্যবহার করছেন রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য। ব্লাড প্রেসারের সিস্টোলিক প্রেসার কমাতে সাহায্য করে এটি। কারণ সর্পগন্ধার উপক্ষার (Alkaloids) হৃৎপিন্ডের উপর অবসাদ ক্রিয়া করে এবং রক্তবহ সূক্ষ্ণ শিরাগুলিকে বিষ্ফোরিত করে এবং এভাবে রক্তচাপ কমায়।
(খ) আয়ুর্বেদ চিকিৎসার উজ্জ্বল সূর্য মহামহোপাধ্যায় কবিরাজ গণনাথ সেন ও ডাক্তার কার্তিকচন্দ্র বসু সর্পগন্ধার মূল/শেকড় বিশ্লেষণ (১৯৩০) করে বলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত উত্তেজনানাশক ও নিদ্রাকারক। উপযুক্ত মাত্রায় সেবন করলে সুনিদ্রা ও উন্মত্ততা হ্রাস পায়।’ তাই উন্মাদ চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্পগন্ধার মূল ব্যবহার হয়।
২। বিষধর সাপে কামড়ালে হৃদযন্ত্রে তীব্র বায়ুর চাপ সৃষ্টি হয়, যার ফলে রক্তের তঞ্চন ক্রিয়া অসম্ভব বেড়ে যায় এবং একসময় হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সর্পগন্ধা বায়ুচাপ দমন করে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে চিকিৎসকরা চিকিৎসা করার সময় পান।
৩। এর মূল অনিদ্রা, রক্তচাপ, উত্তেজনা ও পাগলামি ছাড়াও দুশ্চিন্তা ও মূর্ছা রোগসহ বিভিন্ন স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় কার্যকর।
৪। এ ছাড়াও মূলের নির্যাস প্রসব ত্বরান্বিত করে ও তলপেটের ব্যাথা, ডায়রিয়া, আমাশয় এবং কালাজ্বরের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। (
Ghani, 2002)
 

প্রাপ্তিস্থান
বাংলাদেশে প্রায় সব জেলাতেই পাওয়া যায়। তবে, অতিরিক্ত আহরনের ফলে এটি প্রায় বিলুপ্তির পথে।