বিভিন্ন প্রকার খাদ্য উপাদান

খাদ্য উপাদান, কাজ ও উৎস

একটি আদর্শ খাদ্যে ছয় ধরণের পুষ্টি উপাদান থাকে। পুষ্টি উপাদানগুলো নিম্নরূপঃ
 

ক্রঃ

নং

খাদ্যের উপাদান খাদ্য উপাদানের উৎস কাজ দৈনিক প্রয়োজনীয় পরিমাণ/চাহিদা
১।

শ্বেতসার বা

কার্বোহাইড্রেট

চাল, আটা, ভুট্টা, কাউন, চিনা,

সাগু, বার্লি, কচু,  চিনি,

মধু, মিষ্টি, গুড়, মিষ্টি আলু।

এছাড়া ফল যেমন- খেজুর,

আম, কাঁঠাল, কলা ইত্যাদি।

১। শরীরে শক্তি ও তাপ উৎপাদন করে।
২। দেহকে কিটোসিস নামক রোগ থেকে    রক্ষা করে।
৩। স্নেহ জাতীয় পদার্থ দহনে সাহায্যে করে।
৪। আমিষের প্রধাণ  কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্যে করে।

দৈনিক মোট

ক্যালরী চাহিদার

শতকরা ৫০-৬০

ভাগ শ্বেতসার

জাতীয় খাদ্য

থেকে নেওয়া

হয়।

২। আমিষ/প্রোটিন

মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলিজা,

ডাল, সীমবীজ, কাঁঠালের বীজ,

চিনাবাদাম, মটরশুটি ইত্যাদি।

এছাড়া চাল এবং গমেও কিছু

পরিমাণ আমিষ আছে।

১। শরীর গঠন, বৃদ্ধি সাধন, ক্ষয় পুরুণ এবং রক্ষনাবেক্ষণ করে।
২। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৩। মনন শক্তির স্ফুরণ করে।
৪। শরীরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে এবং প্রয়োজনে শরীরে তাপ ও শক্তি উৎপাদন করে। (১ গ্রাম আমিষ থেকে ৪ কিলো ক্যালরী শক্তি পাওয়া যায়।)

পূর্ণ বয়স্ক

প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ১ গ্রাম।
শিশু (৪বৎসর পর্যন্ত)

প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ২-৩ গ্রাম।
কিশোর কিশোরী (১৮ বৎসর পর্যন্ত)

প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ১.৭ গ্রাম।
গর্ভবতী/প্রসুতি মহিলা

প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ২-৩ গ্রাম।

৩। স্নেহ/চর্বি

তৈল, ঘি, মাখন, পনির,

নারিকেল, বাদাম, সয়া-

বিন, সরিষা, তিল, সূর্য-

মুখির বীজ ইত্যাদি।

১। তাপ ও শক্তি  উৎপাদন ও শর্করার পরিপুরক হিসাবে কাজ করে। ( ১ গ্রাম স্নেহ বা চর্বি থেকে ৯ কিলো ক্যালরী শক্তি পাওয়া যায়।)
২। দেহের ত্বককে মসৃন রাখা।
৩। খাবার সুস্বাদু করা।
৪। চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনকে শরীরের কাজে লাগাতে সাহায্যে করা।

পূর্ণ বয়স্ক

প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ১ গ্রাম।
শিশু (১ বৎসর পর্যন্ত)

প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ২-৩ গ্রাম।

৪। ভিটামিন
 

ভিটামিন ‘এ’

(তৈল বা চর্বিতে দ্রবণীয়)

মিষ্টিকুমড়া, পাকাপেঁপে,

গাজর, লালশাক, কচু-

শাক, পালংশাক, পুঁইশাক,

পাকা আম, পাকা কাঁঠাল।

১। দেহের আবরককলা স্বাভাবিক ও সজিব রেখে দেহ-ত্বক মসৃণ ও উজ্জ্বল করে।
২। সি-মিত ও উজ্জ্বল আলোকে দেখতে সাহায্য করে। এই ভিটামিনের অভাবে রাতকানা হয়, চোখ অনধ হয়ে যায়।
৩। দৈহিক গঠন ও বৃদ্ধিতে সাহায্যে করে।
৪। হাড় ও দাত তৈরীতে সহায়ক।
৫। প্রজনন ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখতে সাহায্যে করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
 
ভিটামিন ‘ডি’ জাতীয় খাদ্য (তৈল বা চর্বি দ্রবণীয়)

দুধ, ডিমের কুসুম,

মাখন, মাছের তেল।

 


 

খাদ্য থেকে ক্যাল-

সিয়াম ও ফসফরাস

বিশোষন বাড়ায়।
 
ভিটামিন ‘ই’ (তৈল বা চর্বি দ্রবণীয়)

উদ্ভিজ্জ তেল, গম, যব,

বাদাম, অংকুরিত ডালবীজ।

দেহ, ত্বক ও চুল মসৃন ও উজ্জল করে।  
ভিটামিন ‘কে’ (তৈল বা চর্বি দ্রবণীয়) কলিজা,  বাধাঁকপি।    
থায়ামিন (বি১)
(পানিতে দ্রবণীয়)
     
রিবোফ্লাবিন (বি২)

ঢেঁকি ছাটা চাল, গম, ডিম,

দুধ, মটরশুটি।

খাদ্য পরিপাক হওয়ায় পর জীব কোষের দহন কাজে সাহায্য করে ও বিপাক এর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  
নিয়াসিন জাতিয় খাদ্য কলিজা,মাংস, মাছ, চাল , আটা, চিনাবাদাম। পেলাগ্রা রোগ প্রতিরোধ করে।  
ফলিক এসিড      
সায়ানোকোবাল (বি ১২)      
ভিটামিন সি

আমলকি, পেয়ারা, জাম্বুরা, লেবু,

কমলা, আমড়া, বরই, কামরাঙ্গা,

টমেটো, কাঁচা মরিচ, লেটুস।

দাঁত, হাড়, রক্তকনিকা এবং অন্যান্য জীবকোষ সুস্থ্য ও সবল রাখে। ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে। পুষ্টি ও বিপাক কাজে সাহায্য করে।  
৫। খনিজ লবন
  ক্যালসিয়াম

দুধ, দুধের তৈরী খাবার,

দই, পনির, ছোট মাছের

কাটা, নরম হাড়

হাড় ও দাঁত গঠন করে। দেহের জলীয় অংশ প্রস্তুতে অংশ নেয় এবং হৃৎপিন্ডের স্বাভাবিক সংকোচন ও প্রসারনে সাহায্যে করে।  
লৌহ

মাংস, কলিজা, ডিম,

ডাল, গুড়, টেংরা

মাছের শুটকি, কাঁচা

আম, কালো কচুশাক,

ফুলকপির পাতা,

শালগম, ডাটাশাক ও

অন্যান্য শাক।

রক্তের লাল কনিকা তৈরী করে। এই  লাল কনিকা হৃৎপিন্ড হতে অক্সিজেন বয়ে সারা দেহে পৌছে দেয় এবং দহন কাজে সাহায্য করে।
 
 
আয়োডিন সামুদ্রিক মাছ, আয়োডিন মিশ্রিত খাবার লবণ।    
ফসফরাস      
সালফার      
তামা      
জিংক      
সোডিয়াম      
পটাশিয়াম      
৬। পানি    

এন্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাদ্য

ক্যালরি

ক্যালরি হচ্ছে কর্মশক্তি পরিমাপের একক। দেহকে সচল রাখা এবং দৈনন্দিন কাজ-কর্মের জন্য কর্মশক্তির প্রয়োজন হয়। মানবদেহে খাদ্যের বিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়ে শক্তি যোগায় এবং একটি নিদির্ষ্ট তাপ দেহে সব সময়ই থাকে। যেখানে শক্তি ব্যবহার হয় সেখানে উপজাত দ্রব্য হিসেবে আমরা তাপ পাই। শক্তি মাপা যায় না, কিন্তু তাপ মাপা যায় তাপের মাপ থেকে শক্তির পরিমাপ বোঝা যায়। তাপ শক্তি পরিমাপের একককে ক্যালরি বলে।


সংগাঃ এক ক্যালরি হচ্ছে সেই পরিমাণ তাপ শক্তি যা ১ গ্রাম পানির উপস্থিত অবস্থা (তাপমাত্রা) থেকে ১ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উষ্ণতা বৃদ্ধি করার জন্য ব্যয় হয়। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞানে ক্যালরির পরিবর্তে কিলোক্যালীর হিসেবে তাপ শক্তি গণনা করা হয়। সেই অনুযায়ী পুষ্টি বিজ্ঞানে ক্যালরির সংগা নিম্নরূপঃ
১ (এক) কিলোগ্রাম পানির তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত বাড়াতে যে পরিমাণ তাপশক্তি খরচ হয় সেই পরিমাণ প্রয়োজনীয় শীক্তই হচ্ছে কিলোক্যালরি।


খাদ্যের ক্যালরিঃ খাদ্যস্থিত ক্যালরি থেকে মানবদেহের শক্তির প্রয়োজন পূরণ হয়। বিভিন্ন খাদ্য উপাদানসমূহের মধ্যে ক্যালরির দিক দিয়ে স্নেহ প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট মূল্যবান উপাদান। খাদ্যের দহনে তাপ শক্তির উৎপন্নের পরিমাণ এবং খাদ্যের ক্যালরি মূল্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। গবেষণায় জানা যায়, বিশুদ্ধ অবস্থায় শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ নিম্নরূপঃ

 

১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থেকে ৪.১ কিলোক্যালরি।

১ গ্রাম প্রোটিন থেকে ৫.৬ কিলোক্যিালরি।

১ গ্রাম স্নেহ পদার্থ থেকে ৯.৪৫ কিলোক্যালরি।   

 

কিন্তু খাদ্য হিসেবে গ্রহণের পর ঐ সমস্ত উপাদানের পরিপাক ও বিশোষণের সময় কিছুটা তাপ শক্তি খরচ হয়। ফলে কর্মশক্তি হিসেবে যে পরিমাণ ক্যালরি বা তাপশক্তি পাওয়া যায় তা নিম্নরূপঃ

 

১ গ্রাম বিশুদ্ধ কার্বোহাইড্রেট থেকে ৪ কিলোক্যালরি।

১ গ্রাম বিশুদ্ধ প্রোটিন থেকে ৪ কিলোক্যিালরি।

১ গ্রাম বিশুদ্ধ স্নেহ পদার্থ থেকে ৯ কিলোক্যালরি।   

 

খাদ্যের ক্যালরি মান নির্ণয়  
আমরা প্রতিদিন যেসব খাদ্য বস্তু গ্রহণ করি তাতে উপস্থিত কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও স্নেহ পদার্থের পরিমাণ থেকে বিভিন্ন খাদ্যের ক্যালরিমান বা শক্তির মূল্য খুব সহজেই নির্ণয় করতে পারি। যেমনঃ

১ টি ডিমের ক্যালরি মান

উপাদান প্রাপ্ত ক্যালরি
প্রোটিন ৬ গ্রাম ৬ x ৪ ২৪
স্নেহ পদার্থ ৪ গ্রাম ৪ x ৯ ৩৬
সর্বমোট ক্যালরি ৬০


১০০ গ্রাম আটার ক্যালরি মূল্য

কার্বোহাইড্রেট ৬৯.৪ গ্রাম ২৭৭.৬ কিলোক্যালরি
প্রোটিন ১২.১ গ্রাম ৪৮.৪ কিলোক্যালরি
স্নেহ পদার্থ ১.৭ গ্রাম ১৫.৩ কিলোক্যালরি
মোট ৩৪১.৩ কিলোক্যালরি


১ পরিবেশন দুধ ৮ আউন্স

 উপাদান প্রাপ্ত ক্যালরি 
প্রোটিন ৮ গ্রাম ৮ x ৪ ৩২
কার্বোহাইড্রেট১০ গ্রাম ১০ x ৪ ৪০
স্নেহ পদার্থ ১০ গ্রাম ১০ x ৯ ৯০
সর্বমোট ক্যালরি ১৬২

 

ক্যালরির চাহিদা  
আমাদের জীবন রক্ষার সাথে সাথে যাবতীয় কাজ সম্পাদনের জন্য যেমন শক্তির প্রয়োজন, তেমনি এই শক্তি বজায় রাখার জন্য শক্তি উৎপাদনকারী খাদ্য গ্রহণও প্রয়োজন। প্রত্যেক মানুষেরই বয়স এবং শ্রমভেদে ক্যালরির একটি নির্দিষ্ট চাহিদা রয়েছে। সকল দিকে বিচার করে পুষ্টিবিদগণ বিভিন্ন বয়সে মানুষের ক্যালরির সীমা নির্ধারণ করেছেন।


বয়সভেদে ক্যালরির চাহিদা

বয়সের পার্থক্যের কারণে ক্যালরির চাহিদার তারতম্য ঘটে। যেমনঃ দেহের দ্রুত বৃদ্ধি ও গঠনের জন্য ২ বছর বয়স পর্যন্ত ক্যালরির চাহিদা বেশি থাকে। তৃতীয় বছর বয়স থেকে এই চাহিদার হার কিছুটা কমে আসে। কৈশোর ও যৌবনে আবার চাহিদা কিছু বাড়ে। প্রাপ্ত বয়সে অর্থাৎ ২৫ বছর বয়সের পর ক্যালরির চাহিদা কমতে থাকে। এ ছাড়া গর্ভধারণকালে এবং রোগ ভোগের পর মানুষের ক্যালরির চাহিদা কিছুটা বেশি হয়।


শ্রমভেদে ক্যালরির চাহিদা

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন কিছু না কিছু কাজ বা পরিশ্রম করতে হয়। যার ফলে শরীরের পরিশ্রম অনুযায়ী ক্যালরির প্রয়োজন হয়। মানুষের সঠিক ক্যালরির চাহিদা নির্ণয় করতে হলে প্রত্যেক কাজে তার ব্যয়িত শক্তির পারিমাণ জানা প্রয়োজন। হালকা শ্রম যেমনঃ বিশ্রাম করা, লেখাপড়া, সাজগোজ, খাওয়া , ধীরে হাটা, টাইপিং, গানকরা, সেলাই করা ইত্যাদি কাজে ক্যালরি কম খরচ হয়। দ্রুত কাজ করলে পেশিতে বেশি টান পড়ে এবং ভারী কাজে সমস্ত শরীরে পেশি চালনা দ্রুত হয়, ফলে ক্যালরি বেশি খরচ হয়। যেমনঃ পাহাড়ে ওঠা, মাটি কাটা, রিক্সা চালানো লোহা পেটানো দ্রুত হাটা, সাঁতার কাটা ইত্যাদি।

 

বিভিন্ন কাজে কি পরিমাণ ক্যালরি খরচ হয়, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গবেষণা করেছেন। দৈনন্দিন কাজে যে পরিমাণ ক্যালরি খরচ হয়, তার একটি তালিকা নিম্নরূপ হতে পারেঃ

কাজ ঘন্টায়/প্রতি কেজি ওজনের ক্ষেত্রে ক্যালরির ব্যয়
১) বসা/বিশ্রামরত ১.৭ কিলোক্যালরি

২) ব্যক্তিগত দৈনন্দিন/নিত্য কাজ

(পোশাক পরা, গোসল করা ইত্যাদি)

৩.০ কিলোক্যালরি
৩) হাঁটা (ঘন্টায় ৩ মাইল বেগে) ৪.০ কিলোক্যালরি
৪) খেলাধুলা ৪.০ কিলোক্যালরি
৫) সাধারণ হালকা কাজ ১.৭ কিলোক্যালরি
৬) মাঝারি শ্রম ২.৫ কিলোক্যালরি
৭) ভারি শ্রম ৫.০ কিলোক্যালরি