পুষ্টি অপচয়

পুষ্টি অপচয়ের কারণ

দৈনিক প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাদ্য যথাযথভাবে গ্রহন করা এবং তা শরীরে ঠিকমত কাজে লাগানোর জন্য রান্না করা অপরিহার্য। খাদ্য দ্রব্য রান্না করার  ফলে শক্ত খাদ্যবস্তু নরম হয়ে খাওয়ার এবং হজমের উপযোগী হয, মাছ, মাংস, ডাল, শাক সবজি ইত্যাদি কাঁচা খাওয়া যায় না, সিদ্ধ করে রান্না করলে এগুলো খাওয়ার উপযোগী হয় এবং সহজ পাচ্য হয়, তেল মসলা সহযোগে রান্নার ফলে খাদ্যবস্তু স্বাদে, গন্ধে এবং বর্ণে আকর্ষণীয়, রুচিসম্মত এবং গ্রহনযোগ্য হয় এবং রান্নার ফলে খাদ্যের মধ্যস্থিত ক্ষতিকর জীবানু সমূহের অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু রান্না করার সময় খাবারকে বেশি সুস্বাদু করার জন্যে অধিক মসলা ব্যবহার এবং বেশি সিদ্ধ করার প্রবনতাই বেশি দেখা যায়। এতে খাদ্যের পুষ্টিমানের অনেক অপচয় হয়। রান্না করতে হলে আগুনের তাপ আর পানি ব্যবহার করতেই হবে। আর তাই খাদ্য দ্রব্য কোটা, বাছা, ধোয়া এবং রান্নার সময় আগুনের তাপে এবং পানিতে গলে ও ধুয়ে অনেক পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যায়। রান্নার ফলে শর্করা, আমিষ এবং তেলজাতীয় উপাদান খুব কমই নষ্ট হয়। কিছু কিছু খনিজ লবণ, যেমন-সোডিয়াম, ক্লোরিণ পানিতে দ্রবনীয় ভিটামিন, যেমন- ভিটামিন ‘বি’ এবং ‘সি’ খুব বেশি নষ্ট হয়। শ্বেতসার বা শর্করা জাতীয় খাদ্যের মধ্যে চাল, গম, যব, ভুট্টা, আলু ইত্যাদি কাঁচা খেলে পাকস্থলীর পক্ষে হজম করা কষ্টকর হয়। কিন্তু রান্নার ফলে এসব খাদ্যের বাইরের শক্ত আবরণটি ফেটে যায় এবং শ্বেতসার আবরণ মুক্ত হয়ে পড়ে এবং তাপের ফলে কিছু অংশ ডেক্সট্রিনে পরিণত হয় যা সহজ পাচ্য। রান্নার সময় খাদ্যের পুষ্টিমানের অনেক অপচয় হয়, যেমন-
সাধারণত ভাত রান্নার পূর্বে চালকে ৪/৫ বার অনেক পানি দিয়ে ঘসে ঘসে বা রগড়ায়ে ধোয়ার ফলে পানিতে দ্রবনীয় ভিটামিনসমূহ পানিতে গলে নষ্ট হয়ে যায়। তারপর সাধারণত ১০০ সেঃ তাপমাত্রায় চাল ফুটিয়ে রান্না করা হয়। এতে শর্করা, ধাতব লবণ, ভিটামিন ‘বি’ পানিতে দ্রবনীয় হয়ে মাড় বা ফেন তৈরি হয়, যা ফেলে দিলে ভাত ঝরঝরে হয়। সুতরাং ভাতের মাড় বা ফেন ফেলে দিলে তার সাথে দ্রবীভূত ‘বি’ ভিটামিন ছাড়াও শর্করা শতকরা ১০ ভাগ এবং ফসফরাস শতকরা ৬০ ভাগ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়।
গম থেকে যে আটা বা ময়দা তৈরি হয় তাতে গমের প্রায় সব পুষ্টি উপাদানই বর্তমান থাকে। গমের মধ্যে গ্লাইডিন এবং গ্লুটেন দুই ধরণের আমিষ রয়েছে যা পানির সাথে মিশ্রিত হয়ে আঠাল পদার্থে পরিণত হয়। পাওরুটি তৈরির জন্য সাধারণত ইষ্ট মিশানো হয়, ফলে পাউরুটির পুষ্টিমূল্য বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় ক্ষার জাতীয় বেকিং পাউডার ব্যবহার করা হয় যার সংস্পর্শে ভিটামিন ‘বি’ নষ্ট হয়ে খাদ্যের পুষ্টি মূল্য কমে যায়।
আলু রান্নার সময় কাটার পূর্বে ধুয়ে নিতে হয়। কাটার পর আলুর টুকরা পানির মধ্যে রাখা ঠিক নয়, কারণ ভিটামিন ‘বি ১’, ভিটামিন ‘বি ২’ এবং ভিটামিন ‘সি’ পানিতে দ্রবীভূত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়।

রান্নার ফলে স্নেহ বা চর্বি জাতীয় খাদ্য, যেমন- তেল, ঘি, ডালডা ইত্যাদির তেমন কোন পরিবর্তন ঘটে না, পুষ্টিমূল্য প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। তবে অত্যধিক তাপে স্নেহ পদার্থ ভেঙ্গে প্রথমে ফ্যাটি এসিড এবং গ্লিসারল উৎপন্ন হয়। পরে এই গ্লিসারিন হতে অ্যাক্রোলিন নামক বিষাক্ত পদার্থ তৈরী হয় যা থেকে  পেটের অসুখ হতে পারে।
মাছ, মাংস, ডাল ইত্যাদি আমিষ জাতীয় খাদ্য ভাল করে সিদ্ধ করা প্রয়োজন, নতুবা হজমে অসুবিধা হতে পারে। তাই মাছ, মাংস অল্প তাপে একটু সময় নিয়ে রান্না করলে আমিষ সংকুচিত হয়ে জমাট বেধে যায় না সহজেই পরিপাক হয়। কিন্তু  তাড়া তাড়ি এবং বেশি সিদ্ধ করার জন্যে অনেক সময় ধরে উচ্চ তাপ প্রয়োগ করে রান্না করলে আমিষের গঠন প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে পুষ্টিমূল্য কমে যায়, ফলে শরীরে কম কাজে লাগে। আবার কখনো কখনো অধিক তাপে আমিষের পুষ্টি মূল্য বৃদ্ধি পায়, যেমন-অল্প সিদ্ধ ডাল অপেক্ষা বেশি সিদ্ধ ডাল থেকে শরীর অধিক পরিমাণ আমিষ গ্রহণ করতে পারে। মাংস রান্নার সময় অল্প পানি ব্যবহার করতে হবে এবং মাংসের পানি ফেলে দেয়া উচিত নয় কারণ ফেলে দিলে ধাতব লবণের অপচয় হয়। অত্যধিক উত্তাপে মাংসের ‘বি’ ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়।
মাছ ভাজার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন মাছ তেলের মধ্যে ডুবে থাকে, অন্যথায় মাছের পুষ্টি উপাদানের অপচয় ঘটবে।
ডিম অল্প তাপে সিদ্ধ করা উচিত কিন্তু হাঁসের ডিম মুরগীর ডিমের চেয়ে বেশি সিদ্ধ করতে হবে। ডিম ভাজার সময় ঢেকে নিতে হবে অন্যথায় আলোর সংস্পর্শে ভিটামিন ‘বি ২’ নষ্ট হয়ে যায় ।
তাপে দুধের পুষ্টিমান নষ্ট হয় না কিন' সূর্যের আলোতে রাখলে দুধের ভিটামিন ‘বি ২’ নষ্ট হয়ে যায়।
খনিজ লবণ ও ভিটামিনের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং ভাল উৎস হল শাক সবজি এবং ফলমূল। শাক সবজি রান্না করতে গিয়েই আমরা সবচেয়ে বেশি উপাদান নষ্ট করে থাকি। শাক সবজি কাটা, ধোয়া এবং রান্নার সময় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অপচয় হয়ে থাকে।

পুষ্টি অপচয়ের প্রতিকার

পুষ্টি অপচয় প্রতিকারে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা বা পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
১। ভাত রান্নার সময় অপচয় রোধ করার জন্যে সিদ্ধ চাল রান্নার পূর্বেই বেছে ঝেড়ে নিতে হয়। তারপর অল্প পানিতে ধুয়ে চাল সিদ্ধ হবার জন্য যতটুকু পানির প্রয়োজন ঠিক ততটুকু পানি ব্যবহার করে বসা ভাত রান্না করলে মাড় ফেলার প্রয়োজন হয় না, এতে অনেক পুষ্টি উপাদান নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

২। আলু কাটার সময় খোঁসা ফেলে না দিয়ে খোঁসাসহ কেটে রান্না করলে বেশকিছু পুষ্টি উপাদান রক্ষা করা যায়।
৩। একই তেল দিয়ে বার বার পিঠা, জিলাপী ইত্যাদি ভাজা ঠিক নয় বরং ভাজার জন্য যতটুকু তেলের দরকার ঠিক ততটুকু তেলই ব্যবহার করা শ্রেয়। সুতরাং, স্নেহ জাতীয় পদার্থে অত্যধিক তাপ প্রয়োগ করা উচিত নয়।
৪। মাছ, মাংস, ডাল ইত্যাদি আমিষ জাতীয় খাদ্য ভাল করে সিদ্ধ করা প্রয়োজন, নতুবা হজমে অসুবিধা হতে পারে। তাই মাছ, মাংস অল্প তাপে একটু সময় নিয়ে রান্না করলে আমিষ সংকুচিত হয়ে জমাট বেধে যায় না সহজেই পরিপাক হয়। মাংস রান্নার সময় টুকরাগুলো বড় করে কেটে সাধারণত ৮০ সেঃ তাপমাত্রায় ধীরে ধীরে রান্না করাই শ্রেয়। এতে মাংসের তন্তুসমূহ নরম হয়। মাংস রান্নার সময় অল্প পানি ব্যবহার করতে হবে এবং মাংসের পানি ফেলে দেয়া উচিত নয় কারণ ফেলে দিলে ধাতব লবণের অপচয় হয়। অল্প জ্বালে সিদ্ধ করতে হবে এবং ঢেকে রান্না করতে হবে। অত্যধিক উত্তাপে মাংসের ‘বি’ ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়।
৫। ডাল রান্নার সময় উত্তমরূপে সিদ্ধ করা উচিত। পানির সাথে ফুটালে ডালের পুষ্টিমান নষ্ট হয় না বরং উত্তাপের ফলে আমিষ সহজ পাচ্য হয় এবং অধিক পরিমাণে গ্রহণ করা যায়। আবার কখনো কখনো অধিক তাপে আমিষের পুষ্টি মূল্য বৃদ্ধি পায়, যেমন-অল্প সিদ্ধ ডাল অপেক্ষা বেশি সিদ্ধ ডাল থেকে শরীর অধিক পরিমাণ আমিষ গ্রহণ করতে পারে।
৬। দুধ ভাল করে ফুটিয়ে খাওয়া আবশ্যক। দুধ সহজেই নানা রকম জীবানু দ্বারা সংক্রামিত হতে পারে, তাই কাঁচা দুধ বা একবার ফুটানো ঠান্ডা দুধ খেতে হলে পুনরায় ফুটিয়ে নিতে হবে। দুধ জ্বাল দেয়ার সময় বলক আসার পর প্রায় ১০ মিনিট ফুটাতে হবে। তাপে দুধের পুষ্টিমান নষ্ট হয় না কিন্তু সূর্যের আলোতে রাখলে দুধের ভিটামিন ‘বি ২’ নষ্ট হয়ে যায়।
৭। শাক সবজি কাটা, ধোয়া এবং রান্নার সময় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অপচয় হয়ে থাকে। কিছু কিছু শাক সবজি যেমন-ধনেপাতা, পুঁদিনা পাতা, লেটুস পাতা, গাজর, মূলা, শশা ইত্যাদি কাঁচাই খাওয়া যায়। আবার কতগুলো মোটামুটি সিদ্ধ করলেই খাওয়া যায়। শাক সবজি ফলমূল অনেকক্ষণ খোলা বাতাসে রাখলে পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়। তাই শাক সবজি তাজা ও টাটকা অবস্থায় খাওয়া উচিত। শাক সবজির পুষ্ঠিমানের অপচয় রোধ করার জন্য কয়েকটি নিয়ম বর্ণনা করা হলঃ

ক)  রান্নার ঠিক পূর্বে তাজা শাক সবজি বেছে নিয়ে পরিষ্কার পানিতে ভাল করে ধুয়ে তারপর কাটতে হবে। কাটা শাক সবজি পুনরায় ধোয়া বা পানিতে রাখা যাবে না;
খ) পরিষ্কার এবং ধারালো দা বা বটি দিয়ে যতটা সম্ভব টুকরা বড় বড় এবং সমান সাইজ করে কাটতে হবে। টুকরা ছোট বড় এবং এবড়ো থেবড়ো হলে পুষ্টি উপাদান বেশি নষ্ট হয়;

গ)  সবজি কাটার সময় যতটা সম্ভব খোঁসাসহ কাটতে হবে, কারণ খোঁসার নিচেই বেশির ভাগ ভিটামিন থাকে। প্রয়োজনে খোঁসা পাতলা করে ফেলতে হবে। কাটার পর সাথে সাথে রান্না করতে হবে। যদি রান্না করতে দেরী হয় তাহলে সবজিগুলোকে ঠান্ডা স্থানে ঢেকে রাখা উচিত;
ঘ) ছোট মুখের গর্তযুক্ত পাত্রে  শাক সবজি রান্না করা উচিত। ছড়ানো মুখের পাত্রে রান্না করলে বাতাসের অক্সিজেন সবজির সংস্পর্শে বেশি আসে, ফলে ভিটামিন বেশি নষ্ট হয়;
ঙ) সিদ্ধ করার জন্য যতটুকু পানি প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই পানি ব্যবহার করতে হবে এবং প্রথমে পানি ফুটিয়ে নিয়ে তাতে সবজি ছাড়লে তাতে খাদ্য উপাদান জারিত হয়ে কম নষ্ট হয়। অল্প পানি ব্যবহার করে শাক সবজি রান্না করলে অনেক ভিটামিন ‘সি’ রক্ষা করা যায়;
চ) শাক সবজি সিদ্ধ করা পানি কোন মতেই ফেলা উচিত নয়। এ পানি ডাল বা অন্য তরকারির সাথে ব্যবহার করা অথবা শাকের সাথেই শুকিয়ে নেয়া যেতে পারে;
ছ) শাক সবজি বেশি তাপে অল্প সময়ে রান্না করা উচিত। এত বেশি সিদ্ধ করা উচিত নয় যাতে গলে যায়। এতে পুষ্টি নষ্ট হয় বেশি;
জ) রান্না করার সময় পাত্রের মুখ ঢাকনা দিয়ে শক্ত করে আটকে দিতে হবে যেন বাইরের বাতাস পাত্রের ভিতর প্রবেশ করতে না পারে;
ঝ) শাক সবজির স্বাভাবিক রং বজায় রাখা এবং মাংস, ডাল ইত্যাদি তাড়াতাড়ি সিদ্ধ করার জন্য ক্ষার জাতীয় পদার্থ যেমন- সোডা ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এতে ভিটামিন ‘সি’ এবং ‘বি’ নষ্ট হয়ে যায়; এবং
ঞ) লোহা বা তামার পাত্রে রান্না না করে মাটির বা এলুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করা উচিত। কারণ লোহা এবং তামার সংস্পর্শে ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয়ে যায়।

আমাদের অজ্ঞতা এবং অসতর্কতার দরুন প্রতিদিনই ভুল প্রদ্ধতিতে রান্না করতে গিয়ে আমরা অনেক পুষ্টি উপাদান নষ্ট করে ফেলি, যা করা মোটেই উচিত নয়। এর ফলে গৃহীত খাদ্য থেকে যে পুষ্টি উপাদান পাওয়া উচিত ছিল তা আমরা পাইনা। অতএব, খাদ্য দ্রব্য রান্না করার সময় একটু সতর্ক হলেই পুষ্টি মানের অপচয় অনেকটা রোধ করা যায়।

সূত্রঃ
সমন্বিত ফলিত পুষ্টি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউট (বারটান-
BIRTAN), খামারবাড়ী, ঢাকা।