ড্রামসিডার ব্যবহার পদ্ধতি
জমি তৈরি
জমিকে ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমির আগাছা এবং অন্যান্য আবর্জনা মাটিতে পচিয়ে নিতে হবে। নিচু বিল এলাকায় নভেম্বর মাসে পানি নেমে যাবার পর আর্বজনা ও খড়কুটো সরিয়ে এবং মই দিয়ে বিনা চাষেও সরাসরি বীজ বপন করা যায়। এতেও ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। জমিকে ভালোভাবে সমতল করতে হবে। জমিতে অঙ্কুরিত বীজ বপনের সময় কোনো দাঁড়ানো পানি রাখা যাবে না।

বীজ প্রস্তুত করা ও বোপনের সময়
ভালো বীজ ব্যবহার করতে হবে এবং ভালো অঙ্কুর গজানোর জন্য প্রথমে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ডুবিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং পরে প্রয়োজন অনুযায়ী জাগ দিতে হবে। বোরো মৌসুমে নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে বীজ বপন করতে হবে। আমন মৌসুমে পানি নিস্কাশনের সুযোগ আছে এমন মাঝারি উঁচু জমিতে জুনের শেষার্ধ  থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে বীজ বোনা যায়। তবে বীজ বপনের অন্তত ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই এমন সময় বেছে নিতে হবে।

ড্রামে বীজ ভর্তি ও বপন
ড্রামের দুই-তৃতীয়াংশ অঙ্কুরিত বীজ দ্বারা পূর্ণ করতে হবে। ড্রামে ভর্তি করার পূর্বে অঙ্কুরিত বীজ ছায়াযুক্ত স্থানে প্রায় ২ ঘণ্টা শুকিয়ে নিতে হবে। এতে ড্রামের ছিদ্র দিয়ে বীজগুলো সমহারে পড়বে। ছয়টি ড্রামে বীজ ভরে ড্রামসিডার যন্ত্রটি দিয়ে একসঙ্গে ১২ লাইনে বীজ বপন করা যায়। অঙ্কুর খুব ছোট হলে অতিরিক্ত বীজ পড়ে যাবে, আবার অঙ্কুর বেশী লম্বা হলে ড্রামের ছিদ্র দিয়ে পড়বে না। সাধারণত অঙ্কুরের দৈর্ঘ্য ৪-৫ মিলিমিটার, অর্থাৎ একটি ধানের সমান লম্বা হলেই ভাল হয়। বোনার সময় হাতলের সাথে ২-৩ ফুট লম্বা চিকন এক খন্ড কলা গাছ হালকা মই হিসেবে বেঁধে নিলে জমিতে পায়ের দাগ বা গর্ত মুছে যাবে এবং কিছুটা বীজের অপচয়ও রোধ হবে।
অঙ্কুরিত বীজ ড্রামে ভরার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ড্রামের এক তৃতীয়াংশ অবশ্যই খালি থাকে। ড্রামের গায়ে আঁকা ত্রিভূজাকৃতি চিহ্ন যেন সবসময় সামনের দিকে থাকে। সাধারণত একক ঘন সারিতে বীজ বপন করা উত্তম এবং এতে বিঘাপ্রতি ৩.৫-৪.০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়।

পানি ও সার ব্যবহার
বপনের প্রাথমিক অবস্থায় মাটিতে দাঁড়ানো পানির প্রয়োজন নেই। মাটি রসাল অবস্থায় রাখতে হবে এবং ক্রমান্বয়ে চারার বৃদ্ধির সঙ্গে সেচের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
অনুমোদিত মাত্রায় সার ব্যবহার করতে হবে। নাইট্রোজেন সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এলসিসি ব্যবহার করা যেতে পারে। সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার ফসল, মাটি এবং পরিবেশের জন্য ভাল। এজন্য প্রথমে জানতে হবে কৃষি পরিবেশ অঞ্চল ভিত্তিক মাটির উর্বরতা শ্রেণী এবং জেনে নিতে হবে জমি কোন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। সে অনুযায়ী মৌসুম-ভিত্তিক সারের সুষম মাত্রার সার প্রয়োগ করতে হবে। ফসফেট, পটাশ, জিপসাম ও দস্তা সারের প্রভাব পরবর্তী ফসল পর্যন্ত থাকে। এ জন্য রবি ফসলে ফসফেট, পটাশ ও জিপসাম সার অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করলে দ্বিতীয় ফসলে উল্লিখিত সারগুলোরে মাত্রা অর্ধেক পরিমাণ ব্যবহার করতে হবে। দস্তা সার একবার প্রয়োগ করলে তা পরের তিন ফসলে প্রয়োগ করতে হবে না।
ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা জমিতে কম সময় থাকে তাই এ সার কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি জমি তৈরির শেষ পর্যায়ে, ২য় কিস্তি ধানের গোছায় ৪-৫ টি কুশি অবস্থায় ও ৩য় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৭ পূর্বে দিতে হবে। যে সব জাতের জীবণকাল ১৫০ দিনের বেশি সেক্ষেত্রে জমি তৈরির সময় ইউরিয়া প্রথম কিস্তি এবং পরে সমান তিন কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
ইউরিয়া উপরি-প্রয়োগের সময় মাটিতে অবশ্যই প্রচুর রস থাকতে হবে। সবচাইতে ভাল হয় যদি ক্ষেতে ২-৩ সেন্টিমিটার পানি থাকে। ইউরিয়া প্রয়োগের সাথে সাথে হাতে বা উইডার দিয়ে আগাছা পরিস্কার করা দরকার।
ইউরিয়া সার প্রয়োগের পরেও ধানগাছ যদি হলদে থাকে এবং বাড়বাড়তি কম হয় তাহলে  গন্ধকের অভাব হয়েছে ধরে নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। এরপর হেক্টরপ্রতি ৬০ কেজি বা বিঘাপ্রতি ৮ কেজি জিপসাম সার উপরি-প্রয়োগ করলে ফল পাওয়া যাবে।
যদি ধানগাছ মাঝেমধ্যে খাটো হয়ে বসে যায় এবং পুরাতন পাতায় মরচে পড়া বাদামী  থেকে কমলা রঙ ধারণ করে এবং ধানের কুশি কম থাকে তখন ধরে নিতে হবে  দস্তার অভাব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে  জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। এরপর হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি বা বিঘাপ্রতি ১ কেজি ৩৫০ গ্রাম দস্তা সার উপরি-প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় হেক্টরপ্রতি ২.৫-৩.০ কেজি জিংক সালফেট ১২৫-১৫০ গ্যালন পরিস্কার পানির সাথে মিশিয়ে স্প্রে মেশিনের সাহায্যে দু’কিস্তিতে যথাক্রমে রোপণের ১০-১৫ ও ৩০-৩৫ দিন পর ধানগাছের পাতার উপর ছিটিয়ে দিলে ভাল ফল পাওয়া যায়। এভাবে মূল্যবান দস্তা সারের অপচয় রোধ করা সম্ভব।

সতর্কতা
১। বপনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারী বৃষ্টি হলে বীজ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
২। জমি অসমতল হলে কিংবা ক্ষেতে পানি জমে থাকলে অঙ্কুর পচে যেতে পারে।
৩। যথাযথ অঙ্কুরোদ্‌গম না হলে বীজ বেশি লাগে এবং চারা সমভাবে গজায় না।
৪। যে জমিতে বেশি আগাছা জন্মায় সেখানে আগাছা নাশক ব্যবহার করা জরুরি।
৫। বপনের পরে প্রথম ৭ দিন পাখি ও হাঁস-মুরগির উপদ্রব হতে পারে।
৬। আমন মৌসুমে জমি তৈরির দিন এবং বোরো মৌসুমে পরের দিন বীজ বপন করা উত্তম। আমন মৌসুমে মাঝারি উঁচু জমিতে বৃষ্টি এড়িয়ে বীজ ফেলতে হবে।