সাধারণ তথ্য

ভুমিকা
উদ্ভিদ ও প্রানীজ বিভিন্ন প্রকার জৈব বস্তুকে কিছু বিশেষ প্রজাতির কেঁচোর সাহায্যে কম সময়ে জমিতে প্রয়োগের উপযোগী উন্নত মানের জৈব সারে রুপান্তর করাকে ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার বলে।
ভার্মি-কম্পোস্ট বা কেঁচোসার নিয়ে কাজ করেছে বহুদিন থেকেই বিভিন্ন গবেষনা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা। আবার অনেক বে-সরকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ব্র্যাক, কারিতাসসহ অনেক এনজিও ভার্মি-কম্পোস্ট তৈরিসহ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে বাজারজাতও করছে। কিন্তু ভার্মি-কম্পোস্ট এখনো এদেশের কৃষকের কাছে সুপরিচিত নয়।

কোঁচোর ইতিহাস
কেঁচো কতদিন আগে পৃথিবীতে আর্বিভাব হয়েছিল, তার সঠিক তত্ত্ব নেই, কারণ কেঁচোর শরীর খুব নরম এবং সহজেই পচে যায়। তাই জীবাশ্ব সৃষ্টি হওয়া কঠিন। এর বিবর্তনীয় অবস্থান পতঙ্গের নীচে। কেঁচোর আর্বিভাব সম্পর্কে দুটি উল্লেখযোগ্য ধারণা বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ সমাদৃত। বিজ্ঞানী জে. স্টিফেনসনের (১৯৩০) মতে “কেঁচো আজ থেকে প্রায় ১২ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আর্বিভাব হয়েছিল”। অর্থাৎ দ্বিবীজপত্র গাছ (dicotyledonous) আর্বিভাব হওয়ার পরে। অন্য একদল বিজ্ঞানী আরো পূর্বে (প্রায় ৫৭ কোটি বছর) আবির্ভাবের কথা বলেন।

কেঁচোর প্রজাতি
সারা বিশ্বে ৪,২০০-এর বেশি প্রজাতির কেঁচো আছে। তার মধ্যে আমাদের দেশে ৫০০-র কিছু বেশি প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। যেসব স্থানে দেখা যায় না, তা হল-সমুদ্র, মরুভুমি, সর্বদা বরফাবৃত স্থান এবং যেখানে কোন রকম গাছপালা নেই। অবস্থান অনুসারে কেঁচোকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
১) পেরিগ্রাইন (Perigrine): যারা সব রকম পরিবেশ মানিয়ে নিতে পারে এবং সর্বত্র বিরাজ করে।
২) এনডেমিক (Endemic): যারা কিছু নির্দিষ্ট স্থানে বর্তমান। এরা সব রকম পরিবেশ মানিয়ে নিতে পারে না।


আমাদের দেশে সাধারণতঃ চারটি প্রজাতির কেঁচো, সার তৈরীর জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন-(১) আইসেনিয়া, (২) ইউড্রিলাস, (৩) ফেরেটিমা এবং (৪) পেরিওনিক্স। আইসেনিয়া ফিটিডা (Eisenia foetida) নামক কেঁচোটি মূলতঃ এসেছে জার্মানি থেকে। সম্ভবত সারা বিশ্বে এই প্রজাতির কেঁচোটি  ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে সর্বত্র এটি পাওয়া যায়। বিভিন্ন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় বেঁচে থাকতে পারে। এরা দ্রুত বাড়ে। গড় আয়ু ৭০ দিন। অতি সহজেই এই প্রজাতির কেঁচো উৎপাদন করা যায়। কিছু প্রজাতির কেঁচো আছে, যারা মাটির উপরের স্তরে (২০-৩০ সেমি) থাকতে ভালবাসে, তাদের এপিগি (epige) বলে। মাটির গভীরে (>৩০ সেমি) থাকে, তাদের এন্ডোগি (endoge) বলে। মাটির উপরের দিকে বসবাসকারী কেঁচো সার তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ উপযোগী।
ইউড্রিলাস ইউজেনি (Eudrilus Eugenie) প্রজাতির কেঁচোর আবির্ভাব ঘটেছে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে। দক্ষিণ ভারতের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এদের পাওয়া যায়। গায়ের রং তামাটে, লাল ও গাঢ় বেগুনী রঙের হয়। এই কেঁচোও দ্রুত বাড়ে এবং সার তৈরীর ক্ষেত্রে উপযোগী। কেঁচোর গড় দৈর্ঘ্য ৩২-১৪০ মিমি, ব্যাস ৫-৮ মিমি, শরীর ১৪৫-১৯৬টি খন্ডে বিভক্ত। গড়ে প্রতিদিন ১২ গ্রাম জৈব বস্তু গ্রহন করে। প্রায় ৪০ দিনে পূর্নতা লাভ এবং পুর্ণতায় আসার সাতদিন পর প্রতিদিন  ১টি করে ডিম থেকে ১৬-১৭ দিন পর বাচ্চা কেঁচো (১-৩ টি) জন্ম নেয়। ঠান্ডা ও গরম সহ্য করতে পারে এবং প্রায় ১-৩ বছর বাঁচে।
পেরিওনি এ কাভেটাস (Preionyx excavatus) কেঁচোর আদি নিবাস হল অস্ট্রেলিয়া। এই কেঁচোর পিঠের উপর সামনের অংশের রং ঘন বেগুনী থেকে লালচে-বাদামী এবং নীচের অংশ হালকা রঙের হয়। দৈর্ঘ্য ২৩-১২০ মিমিঃ ব্যাস ২.৫ মিমিঃ। অধিক আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে। পচা পাতা, কাঠ এবং বহমান নদীতেও পাওয়া যায়। জীবনকাল গড় ৪৬ দিন। পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় ২১-২২ দিনে এবং গুটি বা ডিম দিতে থাকে ২৪ দিন পর, প্রতিদিন ১ টি করে। গুটি প্রতি ১-৩ টি কেঁচো যাওয়া যায়।
আমাদের দেশের বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভার্মিকম্পোষ্ট সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা চলছে এবং উন্নত মানের ভার্মিকম্পোট তৈরী করতে ইউড্রিলাস ইউজেনি এবং আইসেনিয়া ফিটিডা-কে বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়। পশ্চিমা দেশ গুলিতে আবার ইউড্রিলাস ফিটিডার ব্যবহার বেশি। ইউড্রিলাস ইউজেনি কেঁচোর সহনশীলতা বেশি। বিভিন্ন জৈব কীটনাশক যেমন-নিম খোল, মহুয়া খোল, গ্লাইরিসিডিয়া, ইউপাটোরিয়াম ইত্যাদির প্রতি অনেক বেশি সহনশীলতা দেখায়।