হাইড্রোপনিক ব্যবহার পদ্ধতি

সাধারণত দুটি উপায়ে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয় :

১। সঞ্চালন পদ্ধতি (Circulating System)
এ পদ্ধতিতে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানসমূহ যথাযথ মাত্রায় মিশ্রিত করে একটি ট্যাংকিতে নেওয়া হয়  এবং পাম্পের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে ট্রেতে পুষ্টি দ্রবণ (Nutrient Solution) সঞ্চালন করে ফসল উৎপাদন করা হয়। প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ৭ থেকে ৮ ঘন্টা পাম্পের সাহায্যে এই সঞ্চালন প্রক্রিয়া চালু রাখা দরকার। এই পদ্ধতিতে প্রাথমিকভাবে প্রথম বছর ট্রে, পাম্প এবং পাইপের আনুসাঙ্গিক খরচ একটু বেশি হলেও পরবর্তী বছর থেকে শুধু রাসায়নিক খাদ্য উপাদানের খরচ প্রয়োজন হয়। ফলে দ্বিতীয় বছর থেকে খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।

পদ্ধতির কার্য প্রণালী
এই পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজিং লোহার তৈরি ট্রে টি একটি Stand এর উপর স্থাপন করে প্লাস্টিক পাইপের সাহায্যে একটি ট্যাংকের সাথে যুক্ত করা হয়। এই ট্যাংক থেকে পাম্পের সাহায্যে রাসায়নিত দ্রব্য মিশ্রিত জলীয় খাদ্য দ্রবণ ট্রেতে সঞ্চালন করা হয়। গ্যালভানাইজিং লোহার ট্রের উপর কর্ক সীটের মাঝে গাছের প্রয়োজনীয় দূরত্ব অনুসারে যেমন, লেটুস ২০ x ২০ সেমি, টমেটো ৫০ x ৪০ সেমি এবং স্ট্রবেরী ৩০ x ৩০ সেমি দূরত্বে গর্ত করতে হয়। উপযুক্ত বয়সের চারা স্পঞ্জ (Sponge) সহ ঐ গর্তে স্থাপন করতে হয়। চারা রোপনের পর ট্যাংক থেকে ট্রের মধ্যে জলীয় দ্রবণ পাম্পের সাহায্যে প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ ঘন্টা সঞ্চালিত করে গাছের অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়। ট্রেতে কমপক্ষে ৬-৮ সেমি পানি সব সময় রাখতে হবে। সাধারণত প্রতি ১২-১৫ দিন অন্তর জলীয় দ্রবণ ট্রেতে যোগ করতে হবে। এই পদ্ধতি সবজি উৎপাদনে pH এবং EC মাত্রা ফসলের চাহিদার মধ্যে রাখতে হয়। সাধারণভাবে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে উৎপাদনের জন্য pH ৫.৮-৬.৫ এর মধ্যে রাখতে হয়। যদি pH এর মাত্রা ৭.০ এর উপরে হয় তবে আয়রন, ম্যাংগানিজ  মলিবডেনামসহ অন্যান্য মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে হাইড্রোক্লোরাইড এসিড (HCL) অথবা ফসফরিক এসিড (
HPO4) বা নাইট্রিক এসিড (HNO3) দিয়ে pH কে কাঙ্খিত মাত্রায় রাখতে হবে। আবার pH যদি ৫.৮ এর বেশি নিচে নেমে যায় তখন NaOH অথবা KOH দিয়ে pH নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। EC এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে জলীয় দ্রবণে খাদ্য উপাদানের উপস্থিতির  মাত্রা সাধারণত EC ১.৫-২.৫ ds/m এর মধ্যে রাখতে হবে। EC এর মাত্রা যদি ২.৫  ds/m উপরে চলে যায় সে ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানি যোগ করতে হবে। প্রতিদিন সকাল ও বিকালে pH এবং EC সমন্বয় করতে হবে।

২। সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতি (Non-Circulating System)
এই পদ্ধতিতে একটি ট্রেতে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানসমূহ পরিমিত মাত্রায় সরবরাহ করে  সরাসরি ফসল উৎপাদন করা হয়। এই পদ্ধতিতে খাদ্য উপাদান সরবরাহের জন্য কোন পাম্প বা পানি সঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না।  এক্ষেত্রে খাদ্য উপাদান মিশ্রিত দ্রবণ ও উহার উপর স্থাপিত  কর্কশীটের  মাঝে ৫-৭ সেমি পরিমাণ জায়গা ফাঁকা  রাখতে হবে এবং কর্কশীটের উপরে ৪-৫টি ছোট ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে যাতে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে এবং গাছ তার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন কর্কশীটের ফাঁকা জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে পারে। ফসলের প্রকারভেদে সাধারণত ২-৩ বার এই খাদ্য উপাদান ট্রেতে যোগ করতে হয়। আমাদের দেশের সাধারণ  মানুষ সহজেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে প্লাস্টিক বালতি, পানির বোতল, মাটির পাতিল, ইত্যাদি ব্যবহার করেও বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং খোলা জায়গায়  সঞ্চালন বিহীন পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করতে পারে। এত খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম হবে।
পদ্ধতির কার্য প্রণালী
এই পদ্ধতিতে ট্রে, প্লাস্টিকের বালতি, অব্যবহৃত বোতল ইত্যাদি ব্যবহার  করে সবজি, ফল, ফুল উৎপাদন করা যেতে পারে।  চারা রোপনের পূর্বে বোতল জলীয় দ্রবণ দ্বারা এমনভাবে পূর্ণ করতে হবে যাতে কর্কসীট ও জলীয়  দ্রবণের মাঝে ৫-৮ সেমি জায়গা ফাঁকা থাকে। তবে বালতি বা বোতলে চারা লাগালে সে ক্ষেত্রে বায়ু চলাচলের জন্য ৩-৪ টি ছিদ্র রাখা দরকার। এই পদ্ধতিতে কোন বৈদ্যুতিক মটর, পাম্প বা পাইপ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। ফলে সহজেই আগ্রহী কৃষকগণ  বাড়ির আশেপাশের খোলা জায়গায় যেমন, বারান্দা, বাড়ির ছাদে এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে।