উৎপাদনযোগ্য ফসল ও চারা উৎপাদন

পাতা জাতীয় সবজিঃ লেটুস, গীমাকলমি, বিলাতি ধনিয়া, বাঁধাকপি।
ফল জাতীয় সবজিঃ টমেটো, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, শসা, খিরা, স্কোয়াস।   
ফলঃ স্ট্রবেরী।
ফুলঃ এ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমল্লিকা, জারবেরা।  

হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের জন্য স্পঞ্জ (Sponge) ব্লক ব্যবহার করা হয়। সাধারণত স্পঞ্জকে ৩০ সেমি x ৩০ সেমি সাইজে কেটে নিতে হয়। এই স্পঞ্জকে ২.৫ সেমি দৈর্ঘ্য এবং ২.৫ সেমি প্রস্থ বর্গাকারে, ডট ডট করে কেটে নিতে হয় এবং এর মাঝে ১ সেমি করে কেটে প্রতিটি বর্গাকারে স্পঞ্জ এর মধ্যে ১ টি করে বীজ বপন করতে হয়। বীজ বপনের পূর্বে বীজকে ১০% ক্যালসিয়াম অথবা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। বীজ বপনের পর স্পঞ্জকে ১টি ছোট ট্রেতে রাখতে হবে। এই ট্রের মধ্যে ৫-৮ সেমি পানি রাখতে হবে যাতে স্পঞ্জটি পানিতে সহজে ভাসতে পারে। চারা গজানোর ২-৩ দিন পর প্রাথমিক অবস্থায় ৫-১০ মিমি খাদ্যপাদান সম্বলিত দ্রবণ ১ বার এবং চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর থেকে চারা রোপনের পূর্ব পর্যন্ত প্রতিদিন ১০-২০ মিলি দ্রবণ দিতে হবে।

হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে শশা চাষাবাদ

হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন ফসলের চারা রোপনের বয়স ও pH মান বিভিন্ন হয়ে থাকে। নিম্নের সারণীতে তা উল্লেখ করা হলোঃ

বিভিন্ন ফসলের চারার বয়স ও pH মান

ফসলের নাম উপযুক্ত চারার বয়স pH মান
টমেটো ৩-৪ সপ্তাহ (২-৩ পাতা অবস্থায়) ৫.৫-৬.৫
লেটুস ২-৩ সপ্তাহ ৬.০-৬.৫
ক্যাপসিকাম ৪-৫ সপ্তাহ ৬.০-৬.৫
স্ট্রবেরী ২-৩ সপ্তাহ (স্টোলন কাটিং) ৫.৫-৬.৫
শসা ২-৩ সপ্তাহ ৫.৮-৬.০
বাঁধা কপি ৪-৫ সপ্তাহ ৬.৫-৭.৫


রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ ও তৈরির পদ্ধতি
জলীয় খাদ্য দ্রবণ (Nutrient solution) তৈরিতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ ও তৈরির পদ্ধতি নিচে বর্ণনা করা হলোঃ

রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ (প্রতি ১০০০ লিটার পানির জন্য)

রাসায়নিক উপাদান পরিমাণ
পটাশিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট ২৭০ গ্রাম
পটাসিয়াম নাইট্রেড ৫৮০ গ্রাম
ক্যালসিয়াম নাইট্রেট ১০০০ গ্রাম
ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ৫১০ গ্রাম
ইডিটিএ আয়রন ৮০ গ্রাম
ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ৬.১০ গ্রাম
বরিক এসিড ১.৮০ গ্রাম
কপার সালফেট ০.৪০ গ্রাম
অ্যামোনিয়াম মলিবডেট ০.৩৮ গ্রাম
জিংক সালফেট ০.৪৪ গ্রাম


জলীয় খাদ্য দ্রবণ (Nutrient solution) তৈরির সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমে Stock solution তৈরি করতে হবে। এই Stock তৈরি করার সময় ক্যালসিয়াম নাইট্রেট এবং  EDTA Iron কে পরিমাপ করে ১০ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে দ্রবণকে Stock solution  ‘A’  নামে নামকরণ করতে হবে। অবশিষ্ট রাসায়নিক  দ্রব্যগুলিকে এক সাথে ১০ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে Stock solution ‘B’  নামে নামকরণ করতে হবে।

১০০০ লিটার জলীয় দ্রবণ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে ১০০০ লিটার পানি ট্যাংকে নিতে হবে। তারপর
Stock solution  ‘A’  থেকে ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকের পানিতে ঢালতে হবে এবং একটি অধাতব দন্ডের সাহায্যে নাড়া চাড়া করে ভালভাবে মিশাতে  হবে। এরপর Stock solution ‘B’ থেকে পূর্বের মত ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকে নিতে হবে এবং অধাতব দন্ডের সাহায্যে পানিতে Stock solution গুলি সমানভাবে মিশাতে হবে।


ফসল চাষ পদ্ধতি
লেটুস
সাধারণত ২-৩ সপ্তাহ বয়সের চারা ট্রের কর্কশীটের উপর গর্তের মধ্যে স্থানান্তর করা হয়। চারা স্থানান্তরের সময় দ্রবনের pH ৫.৮-৬.৫ এর মধ্যে এবং EC এর মাত্রা ১.৫-১.৯ ds/m এর মধ্যে রাখা দরকার। অতঃপর ১০-১৫ দিন পর জলীয় খাদ্য দ্রবণ (Nutrient solution) যোগ করে EC এর মাত্রা বাড়িয়ে ২.০-২.২ ds/m এর মধ্যে রাখতে হবে। চারা লাগানোর ২০ দিন পর থেকে লেটুস সংগ্রহ করা যেতে পারে এবং ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ উপযোগী হয়। সংগ্রহের সময় প্রতিটি গাছের পাতাসহ গড় ওজন প্রায় ৪০০-৬০০ গ্রামের মত হয়ে থাকে। প্রথম বার লেটুস সংগ্রহের পর ঐ একই রাসায়নিক দ্রবণের ভিতর পুনরায় লেটুস লাগিয়ে দ্বিতীয় বার ফসল উৎপাদন করা যায়। সাধারণত শীত মৌসুমে একটি ট্রে থেকে ২-৩ বার লেটুস উৎপাদন করা সম্ভব।

ক্যাপসিকাম
চারার বয়স যখন ৪-৫ সপ্তাহ তখন ক্যাপসিকামের চারা রোপণ করার উপযুক্ত সময়। চারা রোপণের পর দ্রবণের pH মাত্রা ৫.৮-৬.৫ এর মধ্যে এবং EC মাত্রা ১.৫-১.৯ এর মধ্যে রাখা দরকার। গাছে ফুল আসা শুরু হলে EC মাত্রা বাড়িয়ে ২.০-২.৫ এর মধ্যে রাখতে হবে। ক্যাপসিকাম উৎপাদনে মাঝে মাঝে আয়রন (Fe) এর অভাবে উপরের দিকের পাতা হলুদ হয়ে যেতে পারে। গাছে এরুপ অবস্থা দেখা দিলে ১০ গ্রাম EDTA আয়রন ১ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে ১০০০ লিটার দ্রবণের  সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। ক্যাপসিকাম গাছকে সোজা রাখার জন্য X আকারের বাঁশের কিংবা কাঠের তৈরি খুঁটি দিয়ে ঠেস (Support) দিতে হবে। মাঝে মাঝে গাছের নিচের দিকে বয়স্ক পাতাগুলি কেটে পরিষ্কার করে দিতে হবে। সাধারণত চারা লাগানোর ২৫-৩০ দিনের মধ্যে ফুল এবং ৬০-৬৫ দিনের মধ্যে ক্যাপসিকাম উত্তোলন করা সম্ভব। প্রতিটি গাছ থেকে ৮-৯টি ফল উত্তোলন করা সম্ভব। জাতভেদে প্রতিটি ফলের গড় ওজন প্রায় ১৫০-২০০ গ্রাম হতে পারে।

টমেটো
এ পদ্ধতিতে সাধারণত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় চারা রোপনের উপযুক্ত সময়। চারার বয়স যখন ৩-৪ সপ্তাহ কিংবা চারা যখন ২-৩ পাতা অবস্থায় আসে তখন একই পদ্ধতিতে টমেটোর চারা রোপন করতে হয়। টমেটো অম্ল (এসিড) পছন্দকারী শস্য বিধায় এর pH এর মান ৫.৫-৬.৫ এর মাঝামাঝি রাখতে হয়। গাছের দৈহিক বৃদ্ধির পর্যায়ে EC এর মান ১.৫-১.৯ এবং ফুল আসার সময় তা বাড়িয়ে ২.২-২.৫ ds/m এর মধ্যে রাখতে হবে। গাছের বৃদ্ধির পর্যায়ে উপর থেকে সুতা বা শক্ত রশি ঝুলিয়ে গাছকে সোজা ও খাড়া রাখতে হয়। মাঝে মাঝে গাছের পার্শ্ববর্তী শাখা ভেঙ্গে দিলে ফলন ভাল হয়। ট্রেতে খাদ্যের পরিমাণ কমে গেলে ১০-১৫ দিন পর জলীয় খাদ্য দ্রবণ যোগ করতে হবে। মাঝে মাঝে ফুলে হরমোন স্প্রে করলে ফলন অনেক বেড়ে যায়। প্রতিটি গাছে ২০-২৮টি পর্যন্ত ফল ধরে। প্রতিটি ফলের ওজন ১৫০-২০০ গ্রাম। এরুপ গাছ থেকে ২.৫-৫.৫ কেজি টমেটো উৎপন্ন হতে পারে। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি চারা রোপণ করে জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব।

স্ট্রবেরী
স্ট্রবেরী সাধারণত স্টোলন কাটিং এর সাহায্যে বংশ বিস্তার করে থাকে। যখন স্টোলনের বয়স ২-৩ সপ্তাহ তখন রোপনের উপযুক্ত হয় এবং অক্টোবর মাসে চারা রোপণ করে ডিসেম্বর মাস থেকে ফল সংগ্রহ করা সম্ভব। স্ট্রবেরী উৎপাদনের প্রয়োজনীয় pH ৫.৫-৬.৫ এবং EC এর মাত্রা ১.৫-১.৯ এর মধ্যে রাখতে হবে এবং গাছের বয়স ৩০ দিন হলে EC এর মাত্রা বাড়িয়ে ২.০-২.৫ এর মধ্যে রাখতে হবে। প্রতিটি গাছে গড়ে ২৫-৩০ টি ফল ধরে এবং জাত ভেদে গড় ওজন ২০-৩০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।

উপসংহার
প্রতি বছর বাংলাদেশের জনসংখ্যা, আবাসনের জন্য ঘর-বাড়ি, যোগাযোগের জন্য রাস্তা এবং কল-কারখানা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে আবাদ যোগ্য জমির পরিমাণ। বর্ধিত জনসংখ্যার অব্যাহত খাদ্য চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে তাই শুধু আবাদি জমির উপর নির্ভর করা যাবে না। দেশের এমনি অবস্থায় প্রয়োজন অব্যবহৃত খালি জায়গা ও পতিত স্থান শস্য চাষের আওতায় আনা। হাইড্রোপনিক চাষ পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে আরোপযোগ্য একটি কৌশল। এ পদ্ধতি বাড়ির ছাদে, আঙ্গিনায়, বারান্দায় কিংবা চাষের অযোগ্য পতিত জমিতে সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।