মাশরুমের গুরুত্ব
মাশরুম বিষয়ক সকল তথ্য জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র, সাভার, ঢাকা এর সৌজন্যে আপডেট করা হয়েছে

একজন সুস্থ্য লোকের জন্য প্রতিদিন ২০০-২৫০ গ্রাম সবজি খাওয়া উচিত। উন্নত দেশের লোকেরা প্রতিদিন গড়ে ৪০০-৫০০ গ্রাম সবজি খায়। বিশ্বব্যাপী সবজি গ্রহণের তথ্য উপাত্ত থেকে বোঝা যায়, যে দেশ যত বেশি উন্নত সে দেশ ততবেশি সবজি খায়। কারণ সবজিতে পাওয়া যায় দেহকে সুস্থ্য, সবল রোগমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয় সুষম খাদ্য উপাদান ও রোগ প্রতিরোধক ভিটামিন ও মিনারেল। অধিক সবজি খাওয়ার ফলে তারা অধিক কর্মক্ষম থাকেন এবং বেশী আয়ু লাভ করেন। অথচ আমরা প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ গ্রাম (আলু বাদে) সবজি খাচ্ছি। প্রয়োজন ও প্রাপ্তির এই ব্যবধানের কারণে আমাদের দেশের শতকরা ৮৭% লোক অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগেন। এ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে পুষ্টিকর সবজি খাওয়ার অভ্যাস বাড়াতে হবে, আর অধিক পরিমাণে সবজি খেতে হলে অধিক পরিমাণ সবজি উৎপাদন করতে হবে।
আমরা জানি, উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচলিত ২টি পদ্ধতি, একটি হলো আবাদী জমি বাড়িয়ে- সমান্তরাল পদ্ধতি (Horizontal Method) এবং অপরটি হলো প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে- উলম্বিক পদ্ধতি (Vertical Method)। আমাদের দেশে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিক সমহারে সবজি উৎপাদনের উপযোগী জায়গা কমে যাচ্ছে। এক হিসেব মতে দেখা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমি কমে যাচ্ছে। এরই ফলশ্রুতিতে বর্তমানে দেশের ভূমিহীনের সংখ্যা প্রায় ৫০ ভাগের মত, যাদের শুধুমাত্র ঘরটিই একমাত্র অবলম্বন। সুতরাং সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রথম পদ্ধতি অর্থাৎ সমান্তরাল পদ্ধতিটি এদেশের জন্য অচল। তাহলে শুধুমাত্র উলম্বিক পদ্ধতিই আমাদের সমস্যার সমাধান দিতে পারে। কিন্তু এ পদ্ধতির জন্যও নূন্যতম আবাদী জমির দরকার হয়। অথচ দেশের ৫০% লোকের সে সুবিধাও নেই। তাই আমাদের এখন এমন কোন সবজি উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা দরকার যা চাষীরা তাদের ঘরকে ব্যবহার করে উৎপাদন করতে পারেন, আর তা কেবল মাশরুম চাষের মাধ্যমেই সম্ভব।
বিভিন্ন দেশের মাশরুম খাওয়ার অবস্থা লক্ষ্য করলে আবার দেখা যায় যে দেশ যত বেশি উন্নত সে দেশের মানুষ তত বেশি মাশরুম খায়। উদাহরণ স্বরূপ বিশ্বে মাশরুম খাওয়া ও উৎপাদনের ধারা হচ্ছে - বর্তমানে প্রায় ১০০ টি দেশে মাশরুম চাষ হয় যার ৭০% উৎপাদিত হয় চীনে। উৎপাদিত মাশরুমের ৮৫% ব্যবহৃত হয় গ্রুপ-৬ ভূক্ত ৬ টি দেশে যথা - যুক্তরাষ্ট্র ৩০%, জার্মানী ১৭%,  যুক্তরাজ্য ১১%, ফ্রান্স ১১%, ইটালী ১০%, কানাডায় ৬%।  বাকী ১৫% মাশরুম খায় অবশিষ্ট বিশ্বের মানুষ। মাশরুমের পুষ্টি ও ঔষধি গুণের কারণে এই চাহিদা দিনে দিনে বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।


প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের কাছে মাশরুম একটি জনপ্রিয় খাবার হিসেবে গুরুত্বপূর্ন। এতে খনিজ পদার্থের পরিমান মাছ ও মাংসের তুলনায় বেশী এবং প্রচলিত সবজীর তুলনায় প্রায় দ্বিগুন। মাশরুমে আমিষের পরিমান আলু থেকে দ্বিগুন, টমেটো থেকে চারগুন এবং কমলা লেবুর থেকে ছয়গুন বেশী। হাদিস শরিফে মাশরুমকে বেহেশতী খাবারের সাথে তুলনা করা হয়েছে (সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফ)।
১। মাশরুমে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও মিনারেল এমন সম্বনিতভাবে আছে যা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে গর্ভবতী মা ও শিশু নিয়মিত মাশরুম খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
২। এতে চর্বি ও শর্করা কম থাকায় এবং আঁশ বেশী থাকায় ডায়বেটিক রোগীদের আদর্শ খাবার হিসেবে গন্য করা হয়।
৩। রক্তের কোলেষ্টেরল কমানোর অন্যতম উপাদান ‘ইরিটাডেনিন’ ‘লোবাষ্টটিন’ এবং ‘এনটাডেনিন’ মাশরুমে থাকায় এটি হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ নিরাময় করে ।
৪। মাশরুমে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন-ডি থাকায় শিশুদের হাড় ও দাঁত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
৫। প্রচুর ফলিক এসিড ও আয়রন সমৃদ্ধ বিধায় মাশরুম রক্তশূন্যতা দূরীকরনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
৬। এতে লিংকজাই-৮ নামক পদার্থ থাকায় হেপাটাইটিস-বি জন্ডিস প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
৭। মাশরুমের বেটা-ডি, গ্লুকেন, ল্যাম্পট্রোল, টারপিনওয়েড এবং বেনজোপাইরিন ক্যান্সার ও টিউমার প্রতিরোধক।
৮। মাশরুমের ট্রাইটারপিন এইডস প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৯। মাশরুমের এডিনোসিন ডেংগু জ্বর প্রতিরোধক। কান মাশরুম (Auricularia spp.) চোখ ও গলা ফোলায় উপকারী। 
১০। বিভিন্ন প্রকার এনজাইম সমৃদ্ধ মাশরুম আমাদের পেটের পীড়ায় উপকারী।
১১। মাশরুমে সালফার সরবরাহকারী এমাইনো এসিড থাকায় তা চুল পড়া ও চুল পাকা প্রতিরোধ করতে সক্ষম।