পুষ্টিমান
মাশরুম বিষয়ক সকল তথ্য জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র, সাভার, ঢাকা এর সৌজন্যে আপডেট করা হয়েছে

মাশরুমের পুষ্টিমান
পুষ্টি বিচারে মাশরুম নিঃসন্দেহে সবার সেরা। কারণ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যেসব উপাদান অতি প্রয়োজনীয় যেমন - প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল সেগুলো মাশরুমে উচুঁ মাত্রায় আছে। অন্যদিকে যেসব খাদ্য উপাদানের আধিক্য আমাদেরকে জটিল মরণব্যাধীর দিকে নিয়ে যায়, যেমন - ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেড তা মাশরুমে নেই বললেই চলে। প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনা মাশরুমে নিম্নলিখিত পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।

 

মাশরুমের পুষ্টিমূল্য (১০০ গ্রাম শুকনা মাশরুম)   
খাদ্য উপাদানের নাম পরিমাণ (গ্রাম) মন্তব্য   
আমিষ ২৫-৩৫ উন্নত ও সম্পূর্ণ আমিষ  
ভিটামিন ও মিনারেল ৫৭-৬০ সব ধরণের ভিটামিন ও মিনারেল   
শর্করা ৫-৬   পানিতে দ্রবনীয়   
চর্বি   ৪-৬  অসম্পৃক্ত চর্বি   

   
প্রোটিন মূল্য 

মাশরুমের প্রোটিন হল অত্যন্ত উন্নত, সম্পূর্ণ এবং নির্দোষ। একটি সম্পূর্ণ প্রোটিনের পূর্বশর্ত হলো মানব দেহের অত্যাবশ্যকীয় ৯টি এমাইনো এসিডের উপস্থিতি। মাশরুমে অপরিহার্য এ ৯টি এমাইনো এসিডই প্রশংসনীয় মাত্রায় আছে। অন্যান্য প্রাণীজ আমিষ যেমন-মাছ, মাংস, ডিমের আমিষ উন্নতমানের হলেও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত চর্বি থাকায় তা গ্রহণে দেহে কোলেস্টরল সমস্যা দেখা দেয়। যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মেদভূড়ি ইত্যাদি জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পক্ষান্তরে মাশরুমের প্রোটিন নির্দোষ। তাছাড়াও প্রোটিনের বিপরীতে ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেটের সর্বনিম্ন উপস্থিতি এবং কোলেস্টরল ভাঙ্গার উপাদান লোভাস্টাটিন, এন্টাডেনিন, ইরিটাডেনিন ও নায়াসিন থাকায় কোলেস্টরল জমার ভয় থাকে না। এ কারণে প্রোটিনের অন্যান্য সব উৎসের তুলনায় মাশরুমের প্রোটিন সর্বোৎকৃষ্ট ও নির্দোষ। নিচের ছকে প্রোটিনের অন্যান্য উৎসের সাথে মাশরুমের তুলনা দেখানো হল

 

প্রতি ১০০ গ্রাম আহার উপযোগী খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ
খাবারের নাম প্রোটিন (গ্রাম)   
মাংস  ২২-২৫ গ্রাম   
মাছ   ১৬-২২ গ্রাম   
ডিম   ১৩ গ্রাম   
ডাল    ২২-৪০ গ্রাম   
মাশরুম    ২৫-৩৫ গ্রাম   

 

মাশরুমের ৯টি অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিডের পরিমাণ (গ্রাম / ১০০ গ্রাম)   
এমাইনো এডিসের নাম Agaricus bisporus Agaricusb edodes Pleurotus florida Pleurotus ostreatus Pleurotus sajorcaju Volvereilla volvacea
Leucine ৭.৫ ৭.৯ ৭.৫ ৬.৮ ৭.০ ৪.৫
Isoleucine ৪.৫ ৪.৯ ৫.২ ৪.২ ৪.৪ ৩.৪
Valine ২.৫ ৩.৭ ৬.৯ ৫.১ ৫.৩    ৫.৪
Tryptophan ২.০ - ১.১ ১.৩ ১.২ ১.৫
Lysine ৯.১ ৩.৯ ৯.৯ ৪.৫ ৫.৭ ৭.১
Threonine ৫.৫ ৫.৯ ৬.১ ৪.৬ ৫.০    ৩.৫   
Phenylalanine ৪.২ ৫.৯ ৩.৫ ৩.৭ ৫.০ ২.৬
Methionine ০.৯ ১.৯ ৩.০ ১.৫ ১.৮ ১.১
Histidine ২.৭ ১.৯ ২.৮ ১.৭ ২.২ ৩.৮
Total essential ৩৮.৯ ৩৬.০ ৪৬.০ ৩৩.৪ ৩৭.৬ ৩২.৯


ফ্যাট মুল্য

মাশরুমের ফ্যাট অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দ্বারা তৈরি যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া স্ফিঙ্গলিপিড ও আরগেস্টেরল থাকায় এর মানকে আরও উন্নত করেছে। স্ফিঙ্গলিপিড থাকায় হাড়ের মজ্জা ও ব্রেন ডেভেলপমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং আরগেস্টেরলের উপস্থিতির কারণে ভিটামিন-ডি সিনথেসিসে সহায়ক হয় যা হাড় ও দাঁত তৈরি এবং ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে। এছাড়া মাশরুমের ফ্যাটে ৭০-৮০% লিনোলিক এসিড আছে যা শরীর সুস্থ্য রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।
 

কার্বোহাইড্রেট মূল্য

আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি যা সম্পূর্ণ খরচ না হয়ে শরীরে জমা হয় এবং নানা ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে। মাশরুমে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম এবং তা পানিতে দ্রবনীয়। ফলে মাশরুমের কার্বোহাইড্রেড শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া এরমধ্যে অধিকাংশ পলিস্যাকারাইড যেমন- গ্লাইকোজেন, বেটা-ডি-গ্লুক্যান, ল্যাম্পট্রোল, লোভাস্টাটিন, এন্টাডেনিন, ইরিটাডেনিন, ট্রাইটারপিন, এডিনোসিন, ইলুডিন প্রভৃতি থাকায় দেহের জটিল রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া মাশরুম এ্যাসিডিক সুগার ও এ্যাসিডিক পলিস্যাকারাইড বিশেষ করে H৫১ সরবরাহ করে। মাশরুমে আঁশের পরিমাণও বেশি। জাত ভেদে ১০-২৮% আঁশ পাওয়া যায়। ফলে ডায়াবেটিকস রোগীদের ইনসুলিনের চাহিদা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভিটামিন ও মিনারেল

ভিটামিন ও মিনারেল দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। প্রতিদিন চাহিদা মাফিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ও মিনারেল গ্রহণ না করলে দেহে বিভিন্ন জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। অল্প পরিমাণে অথচ অত্যাবশ্যকীয় এ খাদ্য উপাদান গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এ অবস্থার সৃষ্টিই হবে না। ভিটামিন ও মিনারেলের উৎস হিসেবে মাশরুমের অবস্থান খুবই উচ্চে। শুকনা মাশরুমে ৫৭%-৬০% ভিটামিন ও মিনারেল (অত্যাবশ্যকীয় ট্রেস এলিমেন্টসহ) বিদ্যমান। আমাদের শরীরের জন্য প্রতিদিন প্রধান প্রধান ভিটামিন ও মিনারেলের যে পরিমাণ প্রয়োজন এবং ১০০ গ্রাম শুকনা মাশরুম যে পরিমাণ সরবরাহ করে তা নিম্নে দেয়া হল

 

 দৈনিক মানবদেহে ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা এবং ১০০ গ্রাম শুকনা মাশরুমে এদের পরিমাণ 
প্রধান প্রধান ভিটামিন ও মিনারেলের নাম দৈনিক চাহিদা  মাশরুমে প্রাপ্তি   
থায়ামিন (বি ১) ১.৪ মিলি গ্রাম ৪.৮ - ৮.৯ মিলি গ্রাম 
রিবোফ্লাভিন (বি ২) ১.৫ মিলি গ্রাম  ৩.৭-৪.৭ মিলি গ্রাম   
নায়াসিন  ১৮.২ মিলি গ্রাম  ৪২-১০৮ মিলি গ্রাম  
ফসফরাস ৪৫০ মিলি গ্রাম  ৭০৮-১৩৪৮ মিলি গ্রাম   
লৌহ  ৯ মিলি গ্রাম   ১৫-১৭ মিলি গ্রাম   
ক্যালসিয়াম  ৪৫০ মিলি গ্রাম ৩৩-১৯৯ মিলি গ্রাম   
কপার ২ মিলি গ্রাম ১২-২২ মিলি গ্রাম  

    
মাশরুমের মোট ash এর মধ্যে পটাসিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ প্রায় ৭০ ভাগ, যার মধ্যে আবার ৪৫ ভাগই হচ্ছে পটাসিয়াম। এছাড়া কপার ও সেলিনিয়াম যথেষ্ট পরিমাণে থাকায় চুল পড়া, চুল পাক রোধসহ মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।  

মাশরুমের স্বাদ
মাশরুম অত্যন্ত সুস্বাদু সবজি। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ মুখোরোচক এই মাশরুমের  প্রতি আকৃষ্ট হয়ে খাদ্য তালিকায় মাশরুমকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যবহৃত হতো অসাধারণ লোভনীয় স্বাদের মাশরুম। বিশ্বব্যাপী ভোজন রসিকরা মাশরুমকে স্বর্গীয় খাবারের সাথে তুলনা করে। মাশরুম শুধু নিজেই স্বাদই খাবার নয়, মাশরুম অন্য খাবারের সাথে ব্যবহার করলে তার স্বাদ বহুগুণে বেড়ে যায়। তাই মাশরুমকে বলা হল পরশস্বাদু খাবার।
ঐতিহাসিক গুরুত্বঃ মাশরুমের স্বাদ এবং পুষ্টি দুটোই অসাধারণ। যে কারণে খৃষ্টপূর্ব ৫০০ সন থেকে মানুষ মাশরুমকে সুস্বাদু খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে আসছে। প্রাচীন ফারাও সম্রাট মাশরুমকে দেবতার খাবার হিসেবে মনে করতেন। আর গ্রীকরা মনে করতেন ‘ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ের ময়দানে জয়লাভের জন্যে প্রয়োজনীয় শৌর্যবীর্য যোগাতে পারে মাশরুম’। চাইনিজরা ‘অমরত্বের সন্ধানে’ মাশরুম খাওয়া শুরু করেন। হাদিস শরীফের সূত্র হতে জানা যায়, ‘মাশরুম হচ্ছে মান্নার নির্যাস থেকে উৎপন্ন অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন খাবার’। ছত্রাকবিদদের মতে মাশরুম থেকেই ‘মাইকোলজি’ শব্দটি এসেছে।