মাশরুম চাষের সুবিধাসমূহ

মাশরুম বিষয়ক সকল তথ্য জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র, সাভার, ঢাকা এর সৌজন্যে আপডেট করা হয়েছে

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মাশরুম চাষের অত্যন্ত উপযোগি। সে সাথে মাশরুম চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণও (যেমন- খড়, কাঠের গুড়া, আখের ছোবড়াসহ বিভিন্ন কৃষিজ ও শিল্পজ বর্জ্য) অত্যন্ত  সস্তা এবং সহজলভ্য।

মাশরুম চাষের সাধারন সুবিধাসমূহঃ
(১) মাশরুম চাষে আবাদী জমি দরকার হয় না।
(২) ঘরের মধ্যে চাষ করা যায়।
(৩) তাকে তাকে সাজিয়ে একটি ঘরকে কয়েকটি ঘরের সমান ব্যবহার করা যায়।
(৪) অত্যন্ত অল্প সময়ে অর্থাৎ মাত্র ৭-১০ দিনের মধ্যে মাশরুম পাওয়া যায় যা বিশ্বের অন্য কোন ফসলের বেলায় প্রযোজ্য নয়।

(৫) বাড়ির যে কেউ মাশরুম চাষে অংশ নিতে পারে।

 

   
ঘরে স্তরে স্তরে সাজিয়ে মাশরুম চাষ  মাশরুম চাষে গৃহিনী

                               
মাশরুম চাষে অর্থনৈতিক সুবিধাঃ
মাশরুম চাষ একটি সর্বোত্তম লাভজনক ব্যবসা। অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে কোন ব্যবসা সর্বাধিক লাভজনক তখনই ধরা যাবে যখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ অনুকূল অবস্থা থাকবে। যেমন-
(ক) কম পুঁজির দরকার হবে।
(খ) বিনিয়োগকৃত অর্থ অল্প সময়ের মধ্যে তুলে আনা সম্ভব হবে এবং
(গ) অল্প শ্রমের মাধ্যমে তা সম্ভব হবে।
অপরদিকে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্তির ক্ষেত্রেঃ
(ক) যদি একক প্রতি ফলন অধিক হয়
(খ) বাজার মূল্য অধিক হয়
(গ) একক প্রতি লাভ অধিক হয়, তবে তা সর্বোত্তম ব্যবসা বটে।

কেবল মাশরুমের ক্ষেত্রেই উপরোক্ত সবকটি বিষয় প্রযোজ্য। তাই মাশরুম ব্যবসা মানেই সর্বোত্তম লাভজনক ব্যবসা। এছাড়া অধিক উৎপাদনের মাধ্যমে বিদেশ থেকে মাশরুম আমদানী কমিয়ে দেশী মুদ্রা সাশ্রয় হবে। আরও অধিক উৎপাদন করা সম্ভব হলে বিদেশে মাশরুম রপ্তানীর মাধ্যমে কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা ঘরে এনে জাতীয় অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।

মাশরুম চাষের সামাজিক সুবিধাঃ
মাশরুম চাষে যে সমস্ত সামাজিক সুবিধা পাওয়া যায় সেগুলো হলোঃ
(১) ঘরে ঘরে মাশরুম চাষ করে অত্যন্ত পুষ্টিকর এই সবজি নিয়মিত খেয়ে দেশে পুষ্টিহীনতা দূর করা সম্ভব হবে।
(২) পুষ্টিহীনতা দূর হলে রোগব্যাধী জনিত ব্যয় সাশ্রয়সহ সমাজের সুস্ততা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
(৩) আর সুস্থ্য সবল দেহই অধিক কর্মক্ষম, ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
(৪) মাশরুম চাষে, সংরক্ষণে, প্রক্রিয়াজাতকরণেও বাজারজাতকরণে কর্মহীন লোকদের নিয়োজিত করে জনগণকে অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
(৫) যে সমস্ত শিক্ষিত যুবক-যুবতী বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত, প্রচলিত সামাজিকতার কারণে শিক্ষিত হবার পর যারা রোদে পুড়ে, মাঠে কাদামাটির সাথে মিশে নিজেদেরকে প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতিতে সম্পৃক্ত করতে অনীহা প্রকাশ করেন, সে সমস্ত বেকার ছেলেমেয়েদের জন্য মাশরুম চাষ একটি আর্শীবাদ। কারণ মাশরুম চাষ করতে রোদে পুড়তে হয়না, কাদামাটির সংস্পর্শে আসতে হয় না, ঘরের মধ্যে তাকে তাকে সাজিয়ে সামান্য শ্রমে অল্প সময়ে ন্যূনতম পুজিতে অধিক এবং স্বাধীন উপার্জন করা সম্ভব। যেহেতু মাশরুম উচ্চবিত্তের সৌন্দর্যচর্চা ও সৌখিন খাবারের উপকরণ। তাই মাশরুম চাষ অত্যন্ত মর্যাদাকর পেশা যেখানে শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা কোন রকম হীনমন্যতায় না ভুগে গর্বিতচিত্তে আত্মনিয়োগ করতে পারবেন। সুতরাং বাংলাদেশে মাশরুম চাষ মানেই আছে বেকার সমস্যা সমাধানের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা।

 

   
মাশরৃম চাষে নারী      মাশরুম চাষে শিক্ষিত যুবক

                                      

(৬) বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। অথচ দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে পর্দা, পুরুষতান্ত্রিকতা অথবা মহিলা শ্রমের সুব্যবস্থা না থাকার মহিলারা উপার্জন বিমুখ। ফলে দেশের অর্ধেক কর্মক্ষম জনশক্তি উন্নয়নের কাজে সম্পৃক্ত নয়। অথচ মাশরুম এমন একটি সবজি যা চাষ করে মহিলারা আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সাথে সংগতি রেখে, স্বামীর যত্ন এবং সন্তান লালন পালন করেও বাড়তি উপার্জন করতে পারেন। তাই মাশরুম চাষ এদেশে মহিলাদের কর্মসংস্থানের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় দ্বার খুলতে পারে।

মাশরুম চাষে পরিবেশের সুবিধাঃ

১। সচরাচর প্রতিদিন আমরা যে সব সবজি খেয়ে থাকি, তার প্রায় সবটাই রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদন করা হয়। সবজিতে রাসায়নিক সার বা কীটনাশক শুধুমাত্র ভোক্তাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে না বরং এগুলো যখন প্রয়োগ করা হয় তখন বায়ুমন্ডলকে দূষিত বা বিষাক্ত করে, মাটিকে বিষাক্ত করে, বৃষ্টির পানিতে সেই বিষ ধুয়ে পানিকেও বিষাক্ত করে। অথচ অধিকাংশ মাশরুমে রাসায়নিক সার বা কীটনাশক কোনটাই ব্যবহার করতে হয় না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘরে সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ উপায়ে মাশরুম উৎপাদন করা হয়। তাই মাশরুম সর্বোচ্চ পরিবেশ এবং শরীরের বান্ধব।
২। মাশরুম চাষে ব্যবহৃত উপকরণসমূহ কৃষি, বনজ ও শিল্পের উপজাত যেগুলোর যত্রতত্র এবং অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষিত করে। সেগুলোকে উৎপাদনের উপকরণ হিসাবে প্রক্রিয়াজাত করে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। ফলে পরিবেশ অধিক দূষনমুক্ত হয়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথাটি এখন জোরের সাথে বলা যায় যে, মাশরুম চাষের মাধ্যমে এদেশের পুষ্টি উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা বেকারত্ব দূরীকরণ (বিশেষ করে মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি), আমদানী ব্যয় হ্রাস এবং রপ্তানী আয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশ উন্নয়নের এক অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের ঘরে ঘরে মাশরুমের চাষ হওয়া দরকার, পরিবারের সকল সদস্যের মাশরুম খাওয়া দরকার এবং মাশরুমের উপকারীতা সবাইকে বুঝিয়ে মাশরুম চাষকে একটি সামাজিক আন্দোলনের পর্যায়ে আনার এখনই সময়।