লবন, চিনি ও সিরকায় সংরক্ষণ

ভূমিকা
লবন, চিনি ও সিরকাযোগে খাদ্য সংরক্ষন পদ্ধতি বহু আগে থেকেই প্রচলিত। সংরক্ষনের জন্য খাবারে লবনের পরিমান ১৫ শতাংশ হলে খাবারে অনুজীব বিস্তার লাভ করতে পারে না। ঘন চিনির সিরাতেও অনুজীব নির্জীব থাকে। সিরাপে চিনির পরিমান ৫০-৬০% হলে অনুজীব জন্মাতে পারে না। তবে ৭০% ঘন সিরাপে অনুজীব একেবারে নির্জীব থাকে। এক কেজি চিনিতে দেড় কাপ পানি দিয়ে জ্বাল দিলে ৭০% ঘন সিরাপ হয়। খাদ্য সংরক্ষনের জন্য সিরকায় এসেটিক এসিডের পরিমান ৪-৬% হওয়া বাঞ্ছনীয়। সাদা এবং মল্ট ভিনিগার উভয় প্রকার সিরকাই সংরক্ষনের জন্য ব্যবহার করা হয়। পিকেল্‌স, রেলিশেস এসব বিদেশী খাবার সিরকায় সংরক্ষন করা হয়। লবন, চিনি ও সিরকাযোগে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসমুহ-

পিকেল্‌স

শীতের সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ ইত্যাদি সিরকায় ডুবিয়ে রেখে পিকেল্‌স করা হয়। পিকেল্‌স এর গন্ধ ও স্বাদ উন্নত করার জন্য বিভিন্ন প্রকার সুগন্ধি পাতা ও গোটা মসলা দেয়া হয়।

রেলিশেস

ফুলকপি, গাজর, বরবটি, মুলা, শসা, শালগম, কামরাঙা, কাঁচাপেপে ইত্যাদি সবজি ছোট টুকরা করে পিকেল্‌সের মসলা , সিরকা, লবন ও চিনি সহযোগে জ্বাল দিয়ে রেলিশেস তৈরি করা হয়। চাটনি এবং রেলিশেস একই ধরনের খাবার। তবে চাটনি টক ফল দিয়ে তৈরি হয়। চাটনির মত রেলিশেসেও ঝাল দেয়া যায়। রেলিশেসের স্বাদ টক-ঝাল-মিষ্টি হয়ে থাকে।

জেলী

জেলী তৈরি করার সময় ফলের রস ব্যবহার করা হয়। মিহি চালনী বা কাপড়ের সাহায্যে ফলের শাঁসকে ছেঁকে নেয়া হয় বলে ফলের আঁশ বাদ পড়ে যায়। এজন্য প্রস্তুত জেলী বেশ পরিষ্কার ও অনেকটা স্বচ্ছ দেখায়। ফল ও সবজিতে অবস্থিত পেকটিন চিনির উপস্থিতিতে রস অথবা পাল্পকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। যে সমসত্ম ফলে পেকটিনের পরিমাণ বেশী যেমন - পেয়ারা, আম, আনারস, আপেল, পেঁপে, মিষ্টি বেল, টমেটো, ইত্যাদি থেকে জেলী তৈরি করা হয়।

জ্যাম

জ্যাম তৈরি করার সময় ফলের পাল্প ব্যবহার করা হয়। অধিকাংশ ফল থেকেই জ্যাম প্রস্তুত করা যায়। যে সকল ফল বা সবজিতে পেকটিন কম সেক্ষেত্রে ফলের পাল্পের সাথে কিছু পরিমাণ পেকটিন ( ০.৪-০.৫%) মিশিয়ে নিতে হয়। কম পেকটিন যুক্ত ফলের পাল্পের সাথে বেশী পেকটিনযুক্ত ফলের পাল্প মিমিয়ে মিশ্র ফলের জ্যাম তৈরি করা যায়। সাধারণত আম, আনারস, কমলালেবু, তাল, মাল্টা, গাজর, কুমড়া, টমেটো, ইত্যাদি ফল ও সবজি থেকে জ্যাম তৈরি হয়। জেলী ও জ্যাম প্রস্তুতের সময় পেকটিন ছাড়াও সাইট্রিক এসিড বা লেবুর রস ফল/ সবজির রস অথবা পাল্পের সাথে মিশিয়ে নেয়া হয়। মোটামুটি ১০০ গ্রাম লেঁবুর রসে যে সাইট্রিক এসিড আছে তা ৫ গ্রাম সাইট্রিক এসিডের সমান। সাইট্রিক এসিড মিশ্রণে ৩টি কাজ হয়- ক) ফলের শাঁস থেকে পেকটিন মুক্ত করে, খ) খাদ্যের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ায় ও গ) বেশী মিষ্টি মিশ্রিত খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধি করে।

মোরব্বা

ফল অথবা সবজির টুকরা দীর্ঘ সময় চিনির সিরায় ডুবিয়ে পরে সিরা নিংড়িয়ে মোরব্বা তৈরি করা হয়। মোরব্বা তৈরি করার সময় ফল অথবা জলীয়াংশ বেশ কমিয়ে চিনির পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় শুকনো অবস্থায় এনে সংরক্ষণ করা যায়। এটি জ্যামের মত তবে এতে ফল বা সবজির আকৃতি বজায় থাকে। আম, বেল, চালকুমড়া, আনারস, ইত্যাদি ফল ও সবজি থেকে মোরব্বা তৈরি করা হয়।

আচার

রকমারি মশলা মেশানো ফল বা সবজিকে খাওয়ার তেল বা ভিনেগারে ডুবানো অবস্থায় প্রস্তুত খাদ্যকে আচার বলা হয়। আচারে প্রায় শুকনো করা ফল বা সবজির সংগে সরিষার তেল এবং ভিনেগার মিশিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এ পদ্ধতিতে ফল বা সবজির জলীয় জলীয়াংশ বেশ কমে গিয়ে ( ১২% বা কম) তেল বা ভিনেগারে সম্পৃক্ত হয়ে উঠলে এদের সংরক্ষণ ক্ষমতা বেড়ে যায় অর্থাৎ পচন সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আচার তৈরিতে মসলা হিসেবে সরিষা, আদা, রসুন, হলুদ, মরিচ, মেঁথি, কালজিরা, ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া টকমিস্টি করার  জন্য চিনি এবং অ্যাসেটিক এসিড অথবা ভিনেগার ব্যবহার করা হয়। তন্ডুল জাতীয় খাদ্য যেমন- ভাত, রুটি, লুচি, পরোটা, ইত্যাদির সংগে অল্প পরিমাণ আচার মিশ্রণে খাদ্যকে বেশ মুখরোচক করে তোলে। আচারে ব্যবহৃত সরিষার তেল ও এসিড প্রিজারভেটিভ হিসেবে কাজ করে। সাধারনত কাঁচা আম, আমড়া, জলপাই, চালতা, গাজর, রসুন, ফুরকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, সাতকড়া ইত্যাদি থেকে আচার তৈরি করা হয়।

চাটনী

সাধারণত লবণ ও চিনি মিশিয়ে চাটনী তৈরি করা হয়। বিভিন্ন মসলা মিশিয়ে চাটনীর স্বাদ ও সুগন্ধ বাড়ানো যায। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য চাটনীতে সোডিয়াম বেনজোয়েট(০.৬%) মেশানো হয়। চাটনী অর্থে যা চেটে চেটে খেতে হয়; ভাত, রুটি, লুচি, ইত্যাদি তন্ডুল জাতীয় খাদ্যের সংগে অল্প পরিমাণ চাটনী মিশিয়ে খেতে ভাল লাগে। চাটনী অন্যান্য খাদ্যকে বেশ সুস্বাদু ও মুখরোচক করে তোলে। বরই, তেতুল, জলপাই, আম, আমড়া ও চালতা, ইত্যাদি থেকে চাটনী তৈরি করা হয়।

সস বা কেচাপ

ফল ও সবজির ঘন শাঁসালে রস বা পাল্পের সংগে বেশী মাত্রায় চিনি, ভিনেগার ও মশলা মিশিয়ে যে খাদ্য প্রস্তুত করে সংরক্ষণ করা হয় সেই খাদ্যকে সস বা কেচাপ বলে। কেচাপ তৈরির সময়ে ফল বা সবজির পাল্প ব্যবহার করা হয়। কেচাপ বা সসে অ্যাসেটিক এসিড বা ভিনেগার মিশ্রিত থাকায় এর সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ে। এছাড়াও প্রিজারভেটিভ হিসেবে কেচাপ বা সসে সোডিয়াম বেনজোয়েট ব্যবহার করা হয়। এই খাদ্যগুলো বেশ মুখরোচক। রুটি, পাউরুটি, ঘি বা তেলে ভাজা খাদ্যদ্রব্যের সংগে অল্প পরিমাণ সস বা কেচাপ মিশিয়ে খেতে বেশ ভাল লাগে। সাধারণত পাকা টমেটো, পাকা তেঁতুল, কাঁচা আম, ইত্যাদি থেকে সস বা কেচাপ তৈরি করা হয়।

স্কোয়াশ

ফলের রসের সাথে চিনি, পানি, সাইট্রিক এসিড ও প্রিজারভেটিব সংযোজন করে স্কোয়াশ তৈরি করা যায়। স্কোয়াশে চিনির পরিমাণ বেশী থাকে বিধায় খাওয়ার পূর্বে পানি মিশিয়ে নিতে হয়।

নেকটার/ জুস

ফলের রসের সাথে পানি, চিনি, সাইট্রিক এসিড ও প্রিজারভেটিব মিশিয়ে নেকটার / জুস তৈরি করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণত নেকটারে টিএসএস- এর পরিমাণ জুসের চেয়ে বেশী থাকে। খাওয়ার সময় নেকটার অথবা জুসে পানি মিশানোর প্রয়োজন পড়ে না।

চিনির সিরায় বা লবনের দ্রবণে সংরক্ষণ

বাসা বাড়ীতে ফলমূল ও শাক সবজি অতি সহজেই কাঁচের বোতলে সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণত ফল চিনির সিরায় এবং শাক - সবজি লবণের দ্রবণে সংরক্ষণ করা হয়।