রোপন ও রোপন পদ্ধতি

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

 

                  

 

মাতৃগাছ রোপণ (Planting of Mother Tree)
পলি ব্যাগ বা মাটির পাত্রে সংরক্ষিত কলম /চারা পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলে বছরের যে কোন সময়েই মাতৃগাছ হিসেবে রোপন করা যায়। কিন্তু গ্রীষ্মও বর্ষা মৌসুম মাতৃগাছ রোপনের উত্তম সময়।

মাতৃবাগানের জন্য জমি নির্বাচন
প্লাবনমুক্ত উঁচু জমি যেখানে বর্ষার পানি দাঁড়ায় না এমন স্থান মাতৃগাছ রোপনের জন্য করা উচিৎ। নির্বাচিত জমিতে বর্ষা শুরুর আগেই ৭৫ সেমি আকারের গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্ত খননকালে গর্তের উপরের অর্ধেক মাটি একপার্শ্বে এবং নিচের অর্ধেক মাটি অপর পার্শ্বে রাখতে হবে। মাটি থেকে সকল প্রকার আগাছা, ঘাস ও শিকড় বেছে ফেলতে হবে। অতঃপর উপরের অর্ধেক মাটির সাথে পচা গোবর বা পচা পাতা সার মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে। ভরাটের সময় গর্তের উপরের অর্ধেক মাটি গর্তের উপরে দিতে হবে। সার প্রয়োগের ১-২ সপ্তাহ পর গাছ লাগানো উচিৎ।

মাতৃগাছের জন্য চারা কলম পরিবহণ (Transportion of Mother Trees)
নার্সারিতে সাধারণত তিন ধরনের চারা পাওয়া যায়। এগুলি হল- পলিব্যাগের চারা, পটির চারা এবং কাদামাটির বলসহ চারা। চারার ধরণের উপর ভিত্তি করে এগুলির পরিবহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। পলিব্যাগের চারা পরিবহন অধিকতর সহজ। অপরপক্ষে পট এবং মাটির বলসহ চারা পরিবহনে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ যাতে পট থেকে শেকড়শুদ্ধ চারা বেরিয়ে না আসে এবং মাটির বলটি ভেঙ্গে না যায়। চারা/কলম পরিবহনের সময় যে সব ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা জরুরি তা হলঃ

 

ক) পরিবহনের সময় চারা /কলমগুলি মশারির নেট দিয়ে ঢেকে দিয়ে দিতে হবে,যাতে বাতাসে চারার পাতাগুলি নষ্ট না হয়।
খ) চারা/কলমগুলি ট্রাক/পিক-আপ বা অন্য কোন যানবাহনে উঠানোর বা নামানোর সময় বাম হাত চারার নিচে  এবং  ডান হাত দিয়ে চারার গোড়া ধরে স্বযত্নে নামানো বা উঠানো উচিত যাতে চারার  গোড়ার মাটিতে টান না পড়ে।
গ) চারা/কলমগুলি উপর থেকে একটা করে ক্রমান্বয়ে নামানো উচিৎ।
ঘ) চারা /কলমগুলি নামানোর পর ছায়াযুক্ত স্থানে খাড়া করে ৩-৭ দিন রাখতে হবে। এসময় সকাল বিকাল চারার পাতায় ও গোড়ায় হালকা পানি সেচ দিতে হবে। বৃষ্টি হলে পানি দেয়ার দরকার নেই। চারা সবসময় গরু-ছাগলের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।
ঙ) পরিবহন জনিত কারণে কোন চারার গোড়ার মাটি ভেঙ্গে গেলে, চারা /কলমগুলি নামানোর সাথে সাথে রিপটিং (পুনরায় পলিব্যাগে স্থানান্তর) করে ছায়াযুক্ত স্থানে ১০-১২ দিন রেখে দিতে হবে। উল্লেখ্য যে এসময় পাতা ঝরে যেতে পারে।এ জন্য দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। পরবর্তীতে নতুন পাতা গজালে চারা/কলমগুলি নির্ধারিত স্থানে লাগানো উচিত।

চারা/কলম লাগানোর কৌশল
ক) চারা/কলমগুলি মাঠে লাগানোর ১ দিন পূর্বে লাগানোর স্থান/গর্তগুলির মাটি কোদালের সাহায্যে উল্টে পাল্টে দিতে হবে।
খ) বিকাল বেলা চারা/কলম লাগানোর  উপযুক্ত সময়।
গ) চারা/কলম লাগানোর সময় গর্তের মাটি সরিয়ে পলি ব্যাগসহ চারা গর্তে নামানোর পর খুব সাবধানে ধারালো চাকু বা ব্লেড দিয়ে পলিব্যগ কেটে সরিয়ে ফেলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোন অবস্থাতেই পলিব্যাগ বা পট থেকে চারা বের করার সময় গোড়ার মাটি ভেঙ্গে না যায়।
ঘ) চারা/কলমগুলি মাঠে লাগানোর পর গোড়ার মাটি ভালোভাবে চেপে দিতে হবে।
ঙ) চারা/কলমগুলি মাঠে লাগানোর পর পরই হালকা পানি সেচ দিতে হবে।
চ) ভারি বৃষ্টির মধ্যে বা কাদাযুক্ত মাটিতে কোন ভাবেই চারা/কলম লাগানো উচিৎ নয়।
ছ) চারা লাগানোর সময় সুস্থ্য, সবল, পরিপূর্ণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত এবং গাঢ় সবুজ পাতা বিশিষ্ট চারা নার্সারি থেকে নির্বাচন করা উচিৎ।  

পলিব্যাগের বাহিরে শিকড় চলে আসলে সেগুলি কেটে দিতে হবে এবং পরিবহনের সময় মাটির বল যাতে ভেঙ্গে না যায় সেজন্য সুতলী দিয়ে বলটিকে ভালভাবে পেঁচিয়ে বেধে দিতে হবে।

মনে রাখা দরকার যে চারার শিকড় খুবই স্পর্শকাতার এবং সহজেই ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। যদি মাটির বলটি ভেঙ্গে যায় তবে পরবর্তীতে চারাটির পানি শোষণ বিঘ্নিত হয়। কাদামাটিমুক্ত চারা বেড থেকে তোলার পূর্বে বেডটি ভিজিয়ে নিতে হবে। অতঃপর কোদাল/শাবলের সাহায্যে চারাটি মাটিসহ এমনভাবে উত্তোলন করা উচিত ।

যাতে প্রধান শেকড় তেমন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। মাটির চারা/কলমের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ কাদা ও গোবর ও সার মিশিয়ে এক মিশ্রণ তৈরি করে তা দিয়ে চারার শেকড়ের চারদিকে আবরণ তৈরি করে বের হয়ে যাওয়া প্রধান শেকড় ও তার শাখা প্রশাখা ঢেকে দিয়ে সুতলি পেচিয়ে কিংবা ছন বা বিচালি দিয়ে মাটির বলটি বেঁধে দেয়া উত্তম। চারা মাটি থেকে উত্তোলনের পর ১৫-২০ দিন হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে হালকা সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চারা/কলম শক্ত (হার্ডেনিং) করণ করা হয়। দূরবর্তী স্থানে চারা পরিবহনের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, চারার পাতা পানি শূন্যতা এবং বাতাসের আঘাত জণিত কারণে নুয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে পরিবহনের পরপরই রোপণ না করে সেগুলিকে একটা ছায়াযুক্ত স্থানে ২/৩ দিন রেখে নিয়মিত পানি দিয়ে চারাকে সতেজ করে অতঃপর রোপণ করা উচিত উলেস্নখ্য চারার যথাযথ শেকড় ও কান্ডের অনুপাত (Root-Shoot-ratio) ঠিক রাখার জন্য পলিব্যাগে চারা উত্তোলনই ভাল।

চারা রোপণ (Planting procedure)
১) রোপণের পূর্বে একটি ধারালো ব্লেড বা চাকু দিয়ে সাবধানে চারার গোড়া থেকে পলি ব্যাগটি কেটে সরিয়ে ফেলতে হবে।
২) অতঃপর পলিব্যাগ বা পটের সমানাকৃতি বিশিষ্ট গর্তে সাবধানে চারাটি স্থাপন করতে হবে যাতে গোড়ার মাটি না ভাঙ্গে।
৩) রোপনের পর চারার চারিদিকে মাটি ভালভাবে চেপে দিতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি শেকড় অঞ্চলে জমতে না পারে । চারার গোড়া জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখার জন্য গোড়া সংলগ্ন মাটি এমনভাবে চেপে দিতে হবে যাতে কেন্দ্রের দিকে সামান্য উঁচু এবং চারপার্শ্বে ঢালু হয়। কেননা সদ্য লাগানোর চারার গোড়ায় পানি থাকলে শেকড়ে পচন ধরে চারাটি মরে যেতে পারে।
৪) রোপনের সময় খেয়াল রাখতে হবে যে নার্সারিতে চারার গোড়া যতটুকু নিচে ছিল গর্তে ঠিক ততটুকুই যেন মাটির ভিতরে থাকে। এছাড়া চারার শিকড় যেন সোজাভাবে মাটির অভ্যন্তরে স্থাপিত হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে । মাটির অধিক গভীরে চারা রোপণের ফলে চারার কান্ড পচে চারাটি মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৫) স্যাঁতস্যাঁতে এবং জলাবদ্ধ জমিতে ঢিবি পদ্ধতিতে চারা রোপন করতে হবে । পাহাড়ের ঢালে উঁচুনিচু জমিতে টেরেস বা কন্টরু পদ্ধতিতে চারা রোপন করতে হবে।
৬) ছোট টব থেকে বড় টবে চারা/কলম স্থানান্তর পদ্ধতি অনেকটা মাটিতে চারা লাগানোর অনুরুপ।

রোপিত চারা সংরক্ষণ (Protection of Planted sapling)
রোপিত চারাকে অবশ্যই প্রবল বাতাস, শিলাবৃষ্টি এবং জীব-জন্তুর হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য খুঁটি ব্যবহার করতে হবে এবং বায়ু চলাচলের সুব্যবস্থা যুক্ত খাঁচা দিয়ে গাছকে বীজ-জনত্তর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ৫ সে. মি. কাঠের খুঁটি অথবা ২.৫ সেমি. ব্যাসের স্টিলের খুঁটি ব্যবহার করা যেতে পারে। খুঁটি তারের ভিতর দিক থাকা বাঞ্ছনীয়। তার জাল বা পাতলা মশারির নেট দ্বারা চারার চারদিকে ঘিরে দেয়া উত্তম।

রোপণ পদ্ধতি (Planting system)
জমির ঢাল, মাতৃগাছের প্রকার, বাগান করার উদ্দেশ্য এবং বাগান ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির ধরনের উপর চারা রোপণ পদ্ধতি নির্ভর করে। অপরপক্ষে রোপণ পদ্ধতির উপর প্রয়োজনীয় সূর্যালোক, বায়ুচলাচল এবং পুষ্টির পরিমান নির্ভর করে। যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আবার প্রতি একক জায়গায় কতটি গাছ লাগানো যাবে তাও রোপণ পদ্ধতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এছাড়া বাগানের সৌন্দর্যও অনেকাংশে রোপন পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। নিম্নে মাতৃগাছ রোপন পদ্ধতি আলোচনা করা হলোঃ

বর্গাকার পদ্ধতি (Square system)
এই পদ্ধতিতে রোপিত গাছ থেকে গাছ ও সারি থেকে সারির দূরত্ব সমান থাকে এবং দুই সারির পাশাপাশি চারটি গাছ মিলে একটি বর্গক্ষেত্র তৈরি করে। বর্গক্ষেত্রের প্রতি কোনায় একটি করে গাছ লাগানো হয়। প্রতিটি গাছ সমান জায়গা পায়। ফলে গাছগুলি সুন্দর ও সুষমভাবে  বেড়ে উঠে। আন্তপরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহের  কাজও যে কোন দিক থেকেই করা যায়। স্বল্পমেয়াদী ও দ্রুতবর্ধনশীল গাছসমূহ এ পদ্ধতিতে রোপন করা হয়। এটি ফলগাছ রোপনের সবচেয়ে সহজ ও সাধারণ পদ্ধতি। এক্ষেত্রে সহজেই বাগানের ভূমি চাষ করা যায়। বহুস্তর বিশিষ্ট ফসলের বাগানও এ পদ্ধতিতে করা সহজ হয়। আম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদি ফলগাছ এ পদ্ধতিতে রোপণ করা যায়।

ষড়ভুজী পদ্ধতি (Hexagonal system)    
এ পদ্ধতি একটা সমবাহু ত্রিভুজাকার পদ্ধতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এখানে পাশাপাশি দুই সারির তিনটি গাছ মিলে একটা সমবাহু ত্রিভুজ তৈরি হয় যার কেন্দ্রে একটি গাছ থাকে। এ পদ্ধতিতে বর্গাকার পদ্ধতির চেয়ে শতকরা ১৫ টি গাছ বেশি রোপণ করা যায়। এ কারণে বাণিজ্যিক বাগানগুলিতে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে বাগানের লে-আউট করা একটু কঠিন হলেও বাগানের সৌন্দর্য অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। বাগানের আন্তপরিচর্যা তিন দিক থেকেই করা যায়।

ক) প্রথমে মাতৃগাছ রোপনের জন্য নির্বাচিত জমির এক প্রান্তে একটি রশি সোজাসুজি ভাবে ধরে আর একটি রশি অপর প্রান্তে ধরতে হবে।
খ) ফিতা ধরে ৩-৪-৫ পদ্ধতিতে ৯০০ কোণ করে নিতে হবে ।
গ) এখন গাছের দূরত্ব অনুযায়ী রশি /বাঁশ /রড দিয়ে সমবাহু ত্রিভুজ করে নিয়ে এক প্রান্ত হতে ত্রিভুজটি বসিয়ে যেতে হবে এবং প্রতিটি কোনায় খুঁটি গাড়তে হবে। এভাবে সহজেই ষড়ভুজী হয়ে যাবে।

পরিকল্পিত রোপণ পদ্ধতি (Planned planting system)
বর্গাকার, ষড়ভুজী ইত্যাদি ছাড়াও নার্সারিতে জায়গার অভাব হলে এক স্থানে সব গাছ সংকুলান করা না গেলে, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ফলের মাতৃগাছ লাগিয়ে সায়ন সংগ্রহ করা যাবে।

এছাড়া ক্লোনাল হেজ পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় বহু সংখ্যাক সায়ন উৎপাদন করা যাবে। বিশেষ করে আমের  ক্ষেত্রে দেখা গেছে ৭৫-১০০ সেমি দূরে দূরে আমগাছ লাগিয়ে, প্রতি বছর প্রতি শতাংশে ১৫,০০০-২০,০০০ সায়ন সংগ্রহ করা যায়। ৮ বছর পর ক্লোনাল হেজকে পুরোপুরি মাথা ছাঁটাই করে পুনরায় নতুনরুপে উজ্জীবিত করা (Rejuvenation) সম্ভব।