মাতৃগাছে সারপ্রয়োগ

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

 

ফল উৎপাদন অনেকটাই মাটির উৎপাদন ক্ষমতা/উর্বরতা এবং মাটির ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি উপাদান সার হিসেবে যোগ করে মাটির উৎপাদন  ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়। চাষাবাদ পদ্ধতিও এমন হওয়া উচিত যা মাটির উৎপাদন ক্ষমতা রক্ষা করবে। মাঠ শস্যের তুলনায় ফলগাছের অধিক পুষ্টি উপাদান দরকার। বাংলাদেশে ফলগাছের বাগানে সার প্রয়োগ অনিয়মিত এবং ক্রটিপূর্ণ। সুতরাং উৎপাদন বৃদ্ধিও জন্য কম ফল উৎপাদনকারী গাছে সারা বছর ধরে নিয়ম মেনে সার প্রয়োগ করা দরকার।

মাতৃগাছের সার প্রয়োগ একটি অত্যাবশ্যক কাজ। সার প্রয়োগে গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং সায়ন উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। মাতৃগাছ থেকে উন্নত মানের অধিক সায়ন পেতে হলে প্রতি বছর মাটিতে সার প্রয়োগ করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ ফল গাছ মাটি থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। তাই প্রতি বছর জমিতে সার প্রয়োগ না করলে মাটির উর্বরতা কমে যায়। ফলশ্রুতিতে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রোগ-পোকার আক্রমণ বৃদ্ধি পায়, সর্বোপরি ফলন কমে যায়। কাজেই সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক পদ্ধতিতে ফলগাছে সার প্রয়োগ করা উচিত। এছাড়া বাড়ন্ত গাছের বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সারের পরিমাণও প্রতিবছর বৃদ্ধি করা উচিত।

সার প্রয়োগের নীতিমালা  (Principles of fertilizer application)
ক) জৈব বা অজৈব কোন প্রকার সারই গাছের গোড়ার খুব কাছে প্রয়োগ করা উচিত নয়। ছোট গাছের ক্ষেত্রে গোড়া থেকে ৩০ সেমি. এবং বড় গাছের ক্ষেত্রে গোড়া থেকে ৫০ সেমি. দূর দিয়ে গাছের বিস্তৃতি (ক্যানোপি) বরাবর মাটির সাথে  মিশিয়ে সার দিতে হবে।
খ) সার প্রয়োগকৃত এলাকা গাছের ক্যানোপির সমান হবে। কারণ শিকড়ের বিস্তৃতি ও ক্যানোপির মধ্যে একটা আন্তসম্পর্ক বিদ্যমান।
গ) ভরদুপুরে গাছের ছায়া যতদুর বিস্তৃত থাকে ঠিক ততটুকু জায়গাতেই সার প্রয়োগ করতে হবে।
ঘ) সকল জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগের পর কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হতে।
ঙ) গোড়ার চারদিকে নালা তৈরি করে তাতেও সার প্রয়োগ করা যায়। সার প্রয়োগের পর নালাগুলি মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
চ) সার প্রয়োগের পর গাছে পানি দিতে হবে, যাতে গাছ সহজেই খাদ্যোপাদানসমূহ পরিশোষণ করতে পারে।
ছ) বৃষ্টির মধ্যে সার প্রয়োগ করা উচিত নয়।
জ) সকল প্রকার সার একত্রে মিশিয়ে প্রয়োগ না করাই ভাল।
ঝ) সার প্রয়োগের পর গাছের চারদিকে মাটি দিয়ে আইল তৈরি করে দেয়া উচিত, যাতে বৃষ্টি বা সেচের পানির সাথে সার ধুয়ে না যায়।
ঞ) সার প্রয়োগের পর মালচিং করলে ইউরিয়া সার এর অপচয় কম হয়।

গাছে সারপ্রয়োগ পদ্ধতি (Methods of fertilizer application)
গাছের খাদ্য সংগহকারী শিকড়ের অবস্থানের উপর নির্ভর করে কতটুকু জায়গায় বা কোন স্থানে সার প্রয়োগ করতে হবে। ফলের প্রজাতি এবং মাটির প্রকৃতির কারণে এ বিষয়ে যথেষ্ট তারতম্য লক্ষ করা যায়। সাধারণত গাছের খাদ্য সংগ্রকারী শেকড়গুলি বৃত্তাকারে সর্ববাহিরের শাখার কাছাকাছি বিরাজ করে। নিম্নে সার প্রয়োগের কার্যকর পদ্ধতিগুলো হলঃ

মাটির উপরিস্তরে সার প্রয়োগ (Top dressing)
ছোট গাছের নিচে ছিটিয়ে সার প্রয়োগ করা যায়। সার প্রয়োগের পর ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে পানি দিলে তবেই সন্তোষজনক ফল পাওয়া যায়। বছরের পর বছর মাটির উপরিস্তরে সার প্রয়োগের ফলে গাছ উক্ত স্তরের কাছাকাছি শিকড় উৎপাদনে সচেষ্ট হয়। অধিকন্তু অগভীরমূলী গাছ শুষ্ক মৌসুমে গভীরমূলী গাছের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকে। এছাড়া ছোট ছোট গর্ত করে সার প্রয়োগ করা সবচেয়ে ভাল ।

নালা পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ (Furrow method)
গাছের শিকড় অঞ্চলের কাছাকাছি সার প্রয়োগের উদ্দেশ্যে নালা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গাছের বহিঃ শাখা-প্রশাখার নিচ দিয়ে বৃত্তাকারে ৬০ সেমি. গভীর নালা খনন করা হয়। অতঃপর নালাটি কম্পোস্ট দিয়ে পূর্ণ করা হয় যার সাথে পরবর্তীতে অন্যান্য সার প্রয়োগ করা হয়। এই পদ্ধতির অসুবিধা হল, শিকড় যতখানি স্থান জুড়ে বিস্তৃত থাকে তার সামান্য একটা অংশে কেবল সার প্রয়োগ করা হয় এবং নালা খননকালে অনেক শেকড় আঘাত প্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়।