অঙ্গজ বংশবিস্তার বা কলম (কাটিং)
 
সংগা

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

কাটিং হল অযৌন বংশবিস্তারের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। গাছের বিভিন্ন অংগ, যেমন - কান্ড, শিকড়, পাতা, পত্রকুড়ি  প্রভৃতি মাতৃগাছ থেকে আলাদা করে রাসায়নিক, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বা পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে শিকড় গজানোর মাধ্যমে মাতৃগাছের অনুরুপ নতুন গাছ উৎপাদনকে কাটিং বলে।
কাটিং-সুবিধা/অসুবিধা

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

কাটিং এর সুবিধাঃ
১. অংগজ বংশবিস্তার পদ্ধতি সমূহের মধ্যে এ পদ্ধতিতে সবচেয়ে সহজে ও কম খরচে অধিক চারা উৎপাদন করা যায়।
২. জোড় কলমের মত এতে কোন জোড় অসামঞ্জস্যতা হয় না।
৩. এ পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় অনেক চারা উৎপাদন করা যায়।
৪. এতে তেমন খুব একটা কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয় না।
৫. মাতৃগাছের গুণাগুণ অক্ষুন্ন রেখে নতুন চারা দ্রুত উৎপন্ন করা যায়।
৬. একটি মাত্র গাছ থেকে অসংখ্য গাছ জন্মানো সম্ভব হয়।
৭. বসত বাড়ীতে হেজ বা বেড়া নির্মাণে ও ফল গাছের বংশবিস্তারে এটি একটি বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় পদ্ধতি।

কাটিং এর অসুবিধাঃ
১. উপযুক্ত পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক সময় কর্তিত অংশের মূল গজায় না।
২. অনেক সময় কাটিং মাটি বাহিত বিভিন্ন রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
৩. কোন কোন সময় শিকড় গজানোর পর মাটির প্রতিকূল অবস্থার কারণে শিকড় নষ্ট হয়ে যায়।
৪. কাটিং থেকে জন্মানো ফল গাছ অতি সহজেই ঝড় বাতাসে উপড়ে যেতে পারে। কারণ এতে কোন প্রধান মূল তৈরী হয় না।
৫. সব গাছে কাটিং সফল হয় না বা কোন কোন ফল গাছে এর সফলতার হার এত কম যে সেক্ষেত্রে এ পদ্ধতি অনুমোদন করা যায় না। যেমন- বীজবিহীন এবং এলাচি লেবুতে কাটিং এর সফলতার হার অনেক বেশি অথচ কাগজি লেবুতে কাটিং সফল হয় না।

কাটিং এর প্রকারভেদ

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

শিকড় কাটিং

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

পরিণত গাছের শিকড় বা শিকড়াংশ মাতৃগাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় চারা উৎপাদন পদ্ধতিকে শিকড় কাটিং বলে। এই পদ্ধতিতে ১৫-২০ সেঃ মিঃ লম্বা এবং পেন্সিল বা আঙ্গুলের মতন মোটা শিকড়ের অংশ তির্যকভাবে কেটে মাটিতে পুতে রাখতে হয়।
এ কলম করার ক্ষেত্রে মাটিতে পরিমিত আদ্রতা নিশ্চিত করতে হবে। কিছুদিন পর কাটিং থেকে শিকড়সহ নতুন শাখা বের হয় এবং নতুন গাছের জন্ম দিবে। এই পদ্ধতিতে পেয়ারা, বেল, ডালিম, লেবু, বাগান বিলাস, এলামন্ডা ইত্যাদি ফল ও ফুলের চারা উৎপাদন করা যায়।  এই পদ্ধতিতে গাছের বংশবিস্তার আমাদের দেশে বর্ষাকালে করা হয়। গাছ নতুন ভাবে যখন ডালপালা ছাড়া শুরু করে তার পূর্বেই এই শিকড় সংগ্রহ করতে হয়। কারণ এই সময় শিকড়ে প্রচুর পরিমাণ খাদ্য মজুদ থাকে। এতে কাটিং এ সফলতার হার বেড়ে যায়। 

শাখা কাটিং

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

গাছের ডাল থেকে যে কাটিং করা হয় তাকে ডাল কাটিং বলা হয়। ভাল কলম পাওয়ার জন্য ডাল কর্তনকে ৪ ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন - শক্ত ডাল কাটিং, আধাশক্ত ডাল কাটিং, কচি ডাল কাটিং এবং কোমল ডাল কাটিং ।

১. শক্ত শাখা কাটিং
জলপাই, ডালিম, জামরুল, পাতাবাহার, জবা, গন্ধরাজ, মুসান্ডা ইত্যাদি গাছের ক্ষেত্রে ৬-১২ মাস বয়সের আঙ্গুল অথবা পেন্সিলের ন্যায় মোটা ডাল নির্বাচন করা হয়। এ সব গাছের ক্ষেত্রে আধা শক্ত ডাল ব্যবহার করেও চারা উৎপাদন করা যায় তবে তা শক্ত ডালের ন্যায় ভালো চারা উৎপাদিত হয় না।

২. আধা শক্ত শাখা কাটিং
লেবু, আঙ্গুর, গোলাপ ইত্যাদি।  এ সকর ডাল পেন্সিলের ন্যায় চিকন অথবা সামান্য মোটা হতে পারে। শক্ত ডাল বা কচি ডাল দিয়েও এ সকল গাছের চারা উৎপাদন করা যায় তবে সে সকল চারা আধাশক্ত ডালের ন্যায় ভাল হয় না।

৩. কচি শাখা কাটিং
আপেল, নাশপাতি, রঙ্গন, ডুরান্ডা ইত্যাদি গাছের জন্য কচি ডাল ব্যবহার করা হয়। এ সকল গাছের ক্ষেত্রে আধা শক্ত ডাল চারা উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কচি ডালের ন্যায় ভাল হয় না।

৪. কোমল শাখা কাটিং
চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, গাঁদা, মিষ্টি আলু ইত্যাদি গাছের ক্ষেত্রে ডালের মাথার দিকের কোমল ডাল বা নতুন গজানো ডগা কাটিং হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এ সকল গাছের ক্ষেত্রে কচি বা আধাশক্ত ডাল চারা উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যায়। তবে তা কোমল ডালের ন্যায় ভালো চারা উৎপাদিত হবে না।

শক্ত বা আধাশক্ত শাখা  কাটিং এর জন্য ডাল নির্বাচনের শর্তাবলী
ক) কাটিং এর জন্য ডাল নির্বাচনের সময় অবশ্যই সুস্থ্য, সবল, ডাল নির্বাচন করতে হবে।
খ) নির্বাচিত ডালের পাতাগুলো ধারালো সিকেচার দিয়ে কেটে ফেলতে হবে।
গ) কাটিং এর জন্য ব্যবহৃত ডালে কমপক্ষে তিনটি গিট বা কুঁড়ি (Bud) থাকতে হবে।
ঘ) গাছের দক্ষিন ও পূর্ব দিকের ডালে কাটিং ভাল হয, সফলতার হার বেশী। কারণ দক্ষিন ও পূর্ব  দিকের ডালে সূর্যের আলো বেশী পড়ে এবং মজুদ খাদ্যের পরিমান বেশী থাকে।
ঙ) কাটিং এর জন্য বৈশাখ হতে আষাঢ় মাস উত্তম তবে শীতকাল  ছাড়া সারা বছরই ডাল কর্তন কলম করা যায়।

চারা তৈরী পদ্ধতি


কাটিং এর জন্য ডাল তৈরীকরণ
কাটিং এর জন্য নির্বাচিত ডালটির উপরের অংশের কাটটি গিটের উপরে গোল করে এবং নিচের অংশের কাটটি গিটের নিচে তেছরা করে কাটতে হবে। এতে কাটিংটির আগা-গোড়া সহজেই চেনা যাবে এবং তেছরা কাটা অংশে বেশী পরিমাণ শিকড় গজানোর সুযোগ পায় । সাধারণত ৬-১২ মাস বয়সের ১৫-২০ সে: মি: লম্বা এবং পেন্সিল বা আঙ্গুলের মত মোটা ডালের অংশ কাটিং হিসেবে কর্তন করা হয়।

চারা তৈরী

ক) কাটিং এর জন্য তৈরিকৃত ডালগুলো উঁচু বীজতলা, টব বা কাঠের ট্রেতে রোপন করা যাবে। বেলে-দোয়াঁশ মাটির সাথে প্রচুর পরিমান পচা গোবর মিশিয়ে বীজতলা তৈরী, টব বা কাঠের ট্রেতে ভর্তি করে কাটিং রোপন করতে হবে।
খ) বীজতলার দৈঘ্য ৩ মিটার ও প্রস্থ ১ মিটার হতে হবে এবং বেডটি উত্তর - দক্ষিন দিকে লম্বা লম্বি হবে।
গ) বীজতলায় ২০ সেমি: পর পর লাইন তৈরী করে প্রতি লাইনে ২০ সেমি: পর পর কাটিং লাগাতে হবে। কাটিং লাগানোর সময় গচি দিয়ে ছিদ্র করে কাটিং এর তেরছা অংশ মাটিতে বসাতে হবে।
ঘ) কাটিং ৪৫ কৌনিক ডিগ্রীতে উত্তর মুখী করে বেডে বসাতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন ১টি গিট সহ এক তৃতীয়াংশ মাটির ভিতরে প্রবেশ করে।
ঙ) কাটিং বসানোর পর কাটিং এর গোড়ার মাটি ভাল ভাবে চেপে দিতে হবে যেন ভিতরে ফাঁকা না থাকে।
চ) এবার পানি দিয়ে বেডটি ভাল ভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।
ছ) হালকা ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে ও মাঝে মাঝে সেচ দিতে হবে।
জ)এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কাটিং হতে কুঁড়ি ও শিকড় গজাবে। তিন মাসের মধ্যে গজানো কাটিং বেড হতে তুলে পটিং করা যাবে, রোপন বা বিক্রয় করা যাবে। কাটিং বেড হতে উঠানোর ৩-৪ ঘন্টা আগে বীজতলার মাটি পানি দিয়ে ভাল ভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। অতপরঃ নিড়ানীর সাহায্যে কাটিং এর গোড়া হতে ৩-৪ ইঞ্চি দুর দিয়ে মাটির বলসহ কাটিংটি উঠাতে হবে। সাথে সাথে পটে / পলিব্যাগে পটিং বা বাগানে রোপন করতে হবে। বিক্রয় করতে হলে কাটিং এর গোড়ার মাটির বলটি নলি সুতা দিয়ে পেঁচিয়ে হালকা ছায়া যুক্ত স্থানে ১০-১৫ দিন হার্ডেনিং করে বিক্রয় করতে হবে। হার্ডেনিং এর সময় গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী দিনে ১-২ বার হালকা সেচ দিতে হবে।

কাটিং এর উপরের কাটা অংশে ছত্রাক নাশক লাগালে রোদ ও রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।  নিচের কাটা অংশে হরমোন ( আই,বি,এ = ইনডোল বিউটারিক এসিড, বাজারে বাণিজ্যিক নাম সুরাটেক্স) ব্যবহার করলে খুব সহজেই শিকড় গজায়।

পাতা কাটিং

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

কিছু কিছু গাছ আছে যেমনঃ পাথর কুচি, মিষ্টি আলু, লেবু, ফনিমনসা, ইত্যাদির পাতা কাটিং হিসাবে ব্যবহার করলে সহজে চারা উৎপাদন করা যায়। এ পদ্ধতিতে সম্পুর্ণ পাতা বা পাতার বিভিন্ন অংশ, যেমনঃ পত্রফলক, বোটাসহ পাতা প্রভৃতি মাতৃগাছ হতে আলাদা করে নতুন চারা উৎপাদনকে পাতা কাটিং কলম বলে। পাতার গোড়া বা অন্যান্য অংশ থেকে শিকড় ও পাতা বা কান্ড জন্মে নতুন চারা উৎপন্ন হয়। পত্র কলমের জন্য অধিক আদ্রতার দরকার হয়।

 

পত্রকুঁড়ি কাটিং

ইন্টারকোঅপারেশন - এএফআইপি প্রকল্পের সৌজন্যে আপডেটকৃত

                  

কিছু কিছু গাছ আছে যাদের পত্রকুঁড়ি কাটিং হিসাবে ব্যবহার করে সহজে চারা উৎপাদন করা যায়। এ পদ্ধতিতে পাতা, পাতার বোটা, ছোট একটুকরা কান্ড ও পত্রাক্ষে অবস্থিত একটি সুপ্ত কুঁড়ির সমন্বয়ে গঠিত হয় পত্রকুঁড়ি কলম। যেমন - চা, এলাচি লেবু ইত্যাদি। যেসব গাছের পাতা থেকে শিকড় বাহির হয় কিন্তু কান্ড বাহির হয় না এমন গাছের জন্য পত্রকুড়ির কাটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শীতের শেষ দিকে সাধারণতঃ পত্রকুঁড়ি কলম করা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে এক মৌসুমেই প্রতিটি কুঁড়ি হতে একটি নতুন চারা উৎপাদন করা যায়।