মৃত্তিকা কণা

বিভিন্ন আকার ও গুণসম্পন্ন মৃত্তিকা কণার সম্বনয়ে মাটির মূল কাঠামো তৈরি হয়। এসব কণার আকার সম্পর্কে গবেষকগণের মধ্যে দেশে দেশে পার্থক্য থাকতে পারে। বর্তমানে মৃত্তিকা কণার আকার পরিমাপের জন্য আর্ন্তজাতিক পদ্ধতি এবং যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতি চালু রয়েছে। এখানে এই দুইটি পদ্ধতিতে নির্ধারিত মৃত্তিকা কণার পরিমাপ উল্লেখ করা হলো। যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতিতে মৃত্তিকা কণা ৭ প্রকার। এর মধ্যে ৫ ধরনের বালি কণা, ১ ধরনের পলি কণা এবং ১ ধরনের কর্দম কণা অপরদিকে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে মৃত্তিকা কণা ৪ প্রকার। এর মধ্যে ২ ধরনের বালি কণা, ১ ধরনের পলি কণা এবং ১ ধরনের কর্দম কণা রয়েছে।

(১) বালি কণা
আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে বালি কণাকে মোট ২ ভাগ করা হয়েছে। যেমন স্থূল বালি কণা ও সূক্ষ্ম বালি কণা। আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম বালির চেয়ে স্থূল বালি সর্বাধিক প্রায় ১০০ গুণ বড়। যুক্তরাষ্ট্র কৃষি বিভাগ কর্তৃক প্রণীত পদ্ধতি অনুসােও ০.০২ থেকে ২.০০ মিলিমিটার ব্যাসের একক কণাকে ৫ ভাগ করা হয়েছে, যেমন- খুব স্থূল, পলি, স্থূল বালি, মধ্যম বালি, সূক্ষ্ম বালি ও খুব সূক্ষ্ম বালি। যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতিতে খুব সূক্ষ্ম বালির চেয়ে খুব স্থূল বালি কণা সর্বাধিক।

মৃত্তিকা কণার নাম ও আকার

মৃত্তিকা কণার নাম

ব্যাস (মিলিমিটার

আন্তর্জাতিক পদ্ধতি

যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতি (USDA)

খুব স্থূল বালি কণা

.০০-.২০

.০০-.০০

স্থূল বালি কণা

.২০-.০২

.০০-.৫০

মধ্যম বালি কণা

-

.৫০-.২৫

সূক্ষ্ম বালি কণা

.২০-.০২

.২৫-.১০

খুব সূক্ষ্ম বালি কণা

-

.১০-.০৫

পলি কণা

.০২-.০০২

.০৫-.০০২

কর্দম কণা

<.০০২

<.০০২


মাটির উর্বরতা ও অন্যান্য গুণাবলীতে বালি কণার প্রভাব
1. উদ্ভিদকে শারিরীকভাবে ধারণ করতে সহায়তা করে।
2. মাটির মূল কাঠামো তৈরি করে।
3. বালিকণা মাটির বায়ূ চরাচল বাড়ায়।
4. মাটির তাপ নিয়ন্ত্রন করে।
5. ভূমি কর্ষণ সহজতা নির্ধারণ করে।
6. বেলে মাটিতে ভূমি ক্ষয় কম হয়।
7. মাটিতে ডেলা তৈরি হয়না, দৃঢ়তা কম থাকে।
8. বালি কণা পানির অনুপ্রবেশ ও অনুস্রবণ হার বাড়ায়।
9. মাটির বহন ক্ষমতা বাড়ায়।
বালি কণা স্বণ্পভাবে ক্ষয়ীভূত হয় এবং রাসায়নিকভাবে অপরিবর্তিত থকে। তাই উদ্ভিদের খাদ্যেপাদান সরবরাহে বালি কণার তেমন প্রত্যক্ষ নাই।


(২) পলি কণা
মৃত্তিকা কণার মধ্যে পলির আকার বালি কণা ও কর্দম কণার মাঝামাঝি। যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতির পরিমাপ অনুসারে পলি কণার ব্যাস ০.০০২-০.০৫ মি.মি, কিন্তু আন্তর্জাতিক পদ্ধতির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতিতে পলির পরিমান বেশি এবং বালির পরিমান কম হবে। মাটির উর্ববরতা পলি কণার প্রভাব বালি কণা ও কর্দম কণার মাঝামাঝি। পলি কণা পলি মাটির কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ কাজে অংশ গ্রহন করে। অন্যান্য রাসায়নিক গুণাবলীতেও পলির ভমিকা বালি ও কর্দম কণার তুলনায় মধ্যম। বিশ্বের যে কোন মাটিতে বিভিন্ন পরিমানে সকল আকারের কণাই উপস্থিত থাকে। এর যে কোন এক প্রকার কণার ঘাটতি থাকলে উক্ত স্থানে উত্তম কৃষি জমি উৎপাদিত হয়না। অবশ্য বালি কণার পরিমানের উপর মাটির ভৌত গুণাবলী ও উর্বরতা অনেকাংশে নির্ভর করে।


(৩) কর্দম কণা
আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ও যুক্তরাষ্ট্র কৃষি বিভাগ অনুসারে ০.০০২ মি.মি. কম ব্যাস বিশিষ্ট মৃত্তিকা কণা কর্দম কণা হিসাবে বিবেচিত হয়। কোন একটি কর্দম কণার আকার অবয়ব দেখার জন্য ইলেকট্রোন মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন হয়। আকারে অতি সূক্ষ্ম হলেও ভূমির উর্বরতায় কর্দম কণার গুরুত্ব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন-

  • পুষ্টি উপাদান সরবরাহঃ উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদান সরবরাহে সরাসরি অংশ গ্রহণ করে। সহজে বিয়োজনযোগ্য মাইটজাত কর্দম কণা উদ্ভিদে প্রচুর পটাশিয়াম সরবরাহ করে।
  • উপাদান শোষণঃ ধনাত্নক আয়ন উপশোষনকারী হিসেবে উপাদান পরিশোষনে সহায়তা করে।
  • মাটির গুণাবলীঃ মাটির সকল রাসায়নিক গুণাবলীতে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব বিস্তার করে।
  • বাফার ক্ষমতাঃ মাটির বাফার ক্ষমতা বাড়ায়।
  • আয়ন বিনিময় প্রক্রিয়াঃ মাটির আয়ন বিনিময় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রন করে।
  • পানি ধারণক্ষমতাঃ মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • মৃত্তিকা - শিকড় সম্পর্কঃ মাটির কণা ও শিকড়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়।
  • পুষ্টি সংরক্ষণঃ উদ্ভিদ খাদ্যোপাদানের সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে। 9. মাটির কমনীয়তাঃ মাটির কমনীয়তা ও সমপ্রসারনশীলতা বৃদ্ধি করে।
  • মাটির কণার উপরায়তনঃ মাটির কণার মোট উপরায়তন (Surface area) বাড়ায়।
  • ভৌত-রাসয়নিক গুণাবলীঃ মাটির ভৌত-রাসয়নিক গুণাবলীতে সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করে।
  • কর্দমের সংযোজনঃ কর্দম সংযোজনের মাধ্যমে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান অপচয় কমায়।
  • মাটির উন্নয়নঃ মাটির উন্নয়নে সহায়তা করে।
  • কলোয়েড গুণাবলীঃ মাটির কলোয়েড গুনাবলী উন্নত করে।

মাটির বালি কণা ও পলি কণার মধ্যে গুণগত পার্থক্যের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কর্দম কণার প্রকারগত পার্থক্য খুবই বেশি। মাটিতে শতাধিক প্রকারের ভিন্ন ভিন্ন গুণ সম্পন্ন কর্দম কণা রয়েছে।

মৃত্তিকা কণার আকার বিশ্লেষণ (Particle size analysis)

কোন মৃত্তিকা নমুনায় বা খনিজ অংশে কোন আকারের মৃত্তিকা কণা কি পরিমানে রয়েছে তা নির্ধারণ করার প্রক্রিয়াকে কণার আকার বিশ্লেষণ বা কারিগরী বিশ্লেষণ বলে। সাধারনত হাইড্রোমিটার পদ্ধতি এবং পিপেট পদ্ধতিতে বালি কণা, পলি কণা ও কর্দম কণার পরিমান নির্ধারন করে ওজনভিত্তিতে শতকরা হারে প্রকাশ করা হয়।