অঙ্গজ বংশবিস্তার বা কলম (বহুভ্রূণীতা Polyembryony)
বহুভ্রূণীতা (Polyembryony)

যখন কোন বীজে দুই বা ততোধিক ভ্রূণ বিদ্যামান থাকে এবং সেই বীজ অনুকূল পরিবেশ বহু সংখ্যক চারা উৎপন্ন করে তখন এ ঘটনাকে বীজের বহুভ্রূণীতা বলে। এক বা একাধিক কারণে বীজে বহুভ্রূণীতা ঘটাতে পারে। লেবুজাতীয় ফলে যে নিউসেলারভ্রূণীতা ঘটে থাকে সেজন্যও বহুভ্রূণীতা হতে পারে। এছাড়া মাঝেমাঝে ভ্রূণথলিতে ডিম্বক নিউক্লিয়াসসহ একাধিক নিউক্লিয়াস গঠিত হয়, এ কারণেও বহুভ্রূণীতা সৃষ্টি হতে পারে। বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে ভ্রূণ বিদারনের ফলেও বীজে বহুভ্রূণীতা দেখা দিতে পারে। কণিফার জাতীয় (conifers) গাছে সচরাচর বহুভ্রূণীতা লক্ষ্য করা যায়। লেবুজাতীয় ফলের প্রায় সকল প্রজাতিতেই বহুভ্রূণীতা পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন প্রজাতির বীজে ভ্রূণের সংখ্যা কম-বেশী হতে পারে। সাধারণত জামির লেবুর (rough lemon) বীজ সর্বাধিক সংখ্যক ভ্রূণ (৫.১) ধারণ করে। তবে জামির লেবুর সব জাতই সমান সংখ্যক ভ্রূণ ধারণ করেনা। এর বিভিন্ন জাতে যেমন যাত্তি খাত্তি, জলন্ধরী খাত্তি প্রভৃতির বীজে গড়ে যথাক্রমে ৫.৩ টি ও ৪.২টি ভ্রূণ পাওয়া যায়। ট্রাইফলিয়েট কমলা বীজে গড়ে ১.৬৪ টি ভ্রূণ লক্ষ্য করা গেছে (সিংহ ও সোল, ১৯৬৩)। বহুভ্রূণ বীজের যে ভ্রূণটি আকারে সবচেয়ে বড় থাকে তার অংকুরোদগম ক্ষমতাও বেশি থাকে। ১৯৩২ সালে ওয়েবার এক পরীক্ষার মাধ্যমে লেবুজাতীয় ফলের বিভিন্ন প্রজতির অ্যাপোমিক্টিক বা অপ্রকৃত চারার শতকরা হার নির্ণয় করেন। এ পরীক্ষায় তিনি লক্ষ্য করেন যে, ম্যান্ডারিণ কমলা, ট্রাইফলিয়েট কমলা, এলাচী লেবু প্রভৃতিতে এই হার যথাক্রমে ৪০-৪৫,৭২ ও ৯০-৯৫%।
বহুভ্রূণীতার ফলে একটি বীজ থেকে যে চারাগুলো উৎপন্ন হয় তার মধ্যে একটি চারা যৌন মিলনের ফলে সৃষ্টি হয় এবং অনেকগুলো অপ্রকৃত উপায়ে যেমন বীজের ভ্রূণপোষাক কলা থেকে উৎপন্ন হয়। এজন্য এ ধরণের চারাকে ভ্রূণপোষাক চারা বা নিউসেলার চারা বলা হয়। প্রকৃত চারা থেকে নিউসেলার চারাগুলো অনেক সবল হয়, এজন্য এদের চিনতে তেমন কোন অসুবিধা হয়না। আমাদের দেশের কমলায় কিছূ কিছু নিউসেলার চারা দেখা গেলেও আমের ক্ষেত্রে কয়েকটি জাত ছাড়া অন্য কোন জাতেই নিউসেলার চারা দেখা যায়না (হোসেন, ১৯৭৬)। তবে ভারতের অনেক আমের জাতেই বহুভ্রূণীতা বিদ্যামান (বোস, ১৯৮৬)।

অযৌনভ্রূণীতা (Apomixis)

কিছু কিছু গাছে ভ্রূণ মিয়েসিস (Meiosis) এবং নিষেকের (Fertilization) মাধ্যমে  উৎপন্ন না হয়ে ভ্রূণথলি বা নিউসেলাসের কোন কোষ থেকে উৎপন্ন হয় বা মিয়োসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয় অথবা হয়না কিন্তু শুধুমাত্র মাতৃগাছের কৌলিতাত্ত্বিক গুণ-সম্পন্ন একটি জাইগোট তৈরী করে (নন-রিকারেন্ট অ্যাপোমিক্সিস একটি ব্যতিক্রম)। এ ধরণের অস্বাভাবিক যৌন-জনন প্রক্রিয়াকে অযৌনভ্রূণীতা বলা হয়। অথ্যাৎ যে প্রক্রিয়ায় যৌন জনন পদ্ধতির স্থলে এ ধরণের অযৌন জনন পদ্ধতিতে ভ্রূণ তৈরী হয় তাকে অ্যাপোমিক্সিস বলে এবং এভাবে উৎপন্ন চারাকে অ্যাপোমিক্‌ট বলে। যে সমস্ত গাছ শুধুমাত্র অ্যাপোমিষ্টিক ভ্রূণ উৎপাদন করে তাদেরকে অবলিগেট অ্যাপোমিক্টস (Obigate apomicts) এবং এ প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক অযৌনভ্রূণীতা বলে এবং যে সমস্ত গাছ উভয় ধরণের অর্থাৎ অ্যাপোমিক্টিক ও যৌন (Sexual) ভ্রূণ উৎপাদন করে তাদেরকে ফ্যাকালটেটিভ অ্যাপোমিক্ট (Facultative apomicts) বলে এবং প্রক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক অযৌনভ্রূণীতা বলা হয়ে থাকে। অযৌনভ্রূণীতাকে আবার চার ভাগে ভাগ করা যায়ঃ

১) রিকারেন্ট অ্যাপোমিক্সিস (Recurrent apomixis)

এ ধরণের অ্যাপোমিক্সিস নিষেক ছাড়াই ডিপ্লয়েড নিউক্লিয়াস ভ্রূণথলির ডিপ্লয়েড কোষ থেকে ভ্রূণ সরাসরি বিকাশ লাভ করে। ফলে ডিম্বকে মাতৃগাছের মতই স্বাভাবিক ডিপ্লয়েড সংখ্যক ক্রোমোজোম বর্তমান থাকে। এ প্রক্রিয়ায় ভ্রূণ গঠনের জন্য বা সজীব শস্য নিউক্লিয়াস (Endosperm) উৎপাদনের জন্য পরাগায়নের প্রয়োজন হয়। Parthenium, Rubus (Apple), Allium, Mahus, Poa প্রভৃতি উদ্ভিদ প্রজাতিসমূহে রিকারেন্ট অ্যাপোমিক্সিস ঘটতে দেখা যায়।

২) নন-রিকারেন্ট অ্যাপোমিক্সিস (Non-recurrent apomixis)

এ ক্ষেত্রে হ্যাপ্লয়েড ডিম্বক নিউক্লিয়াস বা ডিম্বথলির হ্যাপ্লয়েড কোষসমূহ থেকে নিষেক ছাড়াই ভ্রূণ বিকাশ লাভ করে। এর ফলে হ্যাপ্লয়েড উদ্ভিদের সৃষ্টি হয় যারা মাতৃগাছের মাত্র একসেট অর্থ্যাৎ হ্যাপ্লয়েড সংখ্যক ক্রোমোজোম ধারণ করে। এজন্য এসব উদ্ভিদ প্রকৃতিতে বন্ধ্যা হয় এবং পরবর্তীতে বংশ রক্ষা করতে পারেনা। ফলগাছ সাধারণত এ ধরণের ঘটনা সচরাচর দেখা যায়না, তবে কিছু উদ্ভিদ প্রজাতি যেমন Solanum nigram, Lilium sp. ইত্যাদিতে নন-রিকারেন্ট অ্যাপোমিক্সিস ঘটে থাকে। কৌলিতাত্ত্বিক দিক থেকে এ ধরণের অ্যাপোমিক্সিস মূল্যাবান অবদান রাখতে পারে।

৩) নিউসেলারভ্রূণীতা (নিউসেলার বাডিং) বা অস্থানিকভ্রূণীতা (Nucellar or adventitious embryony)

ডিম্বথলির বাইরের ডিপ্লয়েড স্পোরোফাইটিক কোষ যথা নিউসেলাস ও ত্বকের কোষসমূহ থেকে এ ধরণের অ্যাপোমিক্সিস ভ্রূণ গঠিত হয়। লেবুতে এ ধরণের অ্যাপোমিক্সিস প্রায়শই দেখা যায়। এছাড়া আমের কিছু কিছু প্রজাতিতেও নিউসেলারভ্রূণীতা পরিলক্ষিত হয়। রিকারেন্ট অ্যাপোমিক্সিসের সাথে এর পার্থক্য হলো ভ্রূণ ছাড়াও ভ্রূণথলির (embroyo sac) বাইরে অনেকগুলো নিউসেলার ভ্রূণ গঠিত হয়। ফলে স্বাভাবিক উপায়ে নিষেক সংঘটিত হয়ে একটি যৌন ভ্রূণ এবং এছাড়াও কতকগুলো অ্যাপোমিক্টিক ভ্রূণ তৈরী হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে (যেমনঃ opuntia) পরাগায়ন বা নিষেক ছাড়াই স্বঃস্ফুর্তভাবে কতকগুলো অ্যাপোমিষ্টিক ভ্রূণ গঠিত হয়।

(৪) ভেজিটেটিভ অ্যাপোমিক্সিস বা বুলবিল (Vegetative apomixis or bulbil)

ডিম্বথলির বাইরের ডিপ্লয়েড স্পোরোফাইটিক কোষ যথা নিউসেলাস ও ত্বকের কোষ সমুহ থেকে এ ধরণের অ্যাপোমিক্সিস ভ্রূণ গঠিত হয়। লেবুতে এ ধরণের অ্যাপোমিক্সিস প্রায়শই দেখা যায়। আমের কিছু কিছু প্রজাতিতেও নিউসেলার অ্যাপোমিক্সিস পরিলক্ষিত হয়।

অ্যাপোমিক্সিসের তাৎপর্য (Significance)
প্রকৃতিতে সাধারণত পলিপ্লয়েড ও জটিল সংকর উদ্ভিদসমূহে অ্যাপোমিক্সিস ঘটে থাকে। তবে উদ্ভিদ প্রজননের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্ভিদ জাতেও অ্যাপোমিক্সিস ঘটানো যায় এবং এভাবে উৎপন্ন উদ্ভিদসমূহ উদ্যানতত্ত্ববিদ দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা অযৌন পদ্ধতিতে এ উপায়ে উৎপাদিত চারাসমূহ কৌলিকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ ও মাতৃ গুণাগুণসম্পন্ন হয়ে থাকে। এ ছাড়া এসব চারা যৌন পদ্ধতিতে উৎপন্ন চারার মতই চারাচক্র (Seedling cycle) প্রদর্শন করে তরুণ অবস্থা থেকে পরিণত অবস্থায় পোঁছায়।
একবর্ষী, বহুবর্ষী ও অনেক অরণ্য উদ্ভিদের পুনরুৎপাদনের জন্য অ্যাপোমিষ্টিক চারা উৎপাদন দরকার হয়। লেবুজাতীয় ফলের অনেক প্রজাতি ও জাত অ্যাপোমিষ্টিক চারা উৎপন্ন করে থাকে যেগুলোকে সাধারণত সমরূপক (uniform) আদিজোড় বা রুটস্টক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিছু সংখ্যক আপেল প্রজতি স্বপরাগায়িত হয়ে অ্যাপোমিক্সিস প্রদর্শন করে অথচ তারা পরপরাগায়িত হলে সংকর বীজ উৎপন্ন করে। অ্যাপোমিক্সিস বা নিউসেলার চারা উৎপাদনের মাধ্যমে বীজ বাহিত অনেক ভাইরাস রোগ দমন করা যায়। বীজ বাহিত নয় এমন অনেক ভাইরাস জীবাণূকেও এ উপায়ে এড়ানো যায়। অ্যাপোমিক্টিক চারার সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো এ চারাগুলো সম্পূর্ণরূপে ভাইরাসমুক্ত থাকে। (সাধু, ১৯৮৬)।